রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

বাংলা ভাষা আমার গর্ব – শান্তনা রাণী দাস

সংবাদের আলো ডেস্ক: ঢাকার ব্যস্ততম শহরে বাস করেন মিস্টার জলিল সাহেব এবং তার স্ত্রী মিসেস তমা। তারা দুজনেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং বেশ ভালো চাকুরী ও করেন। তাদের বছর দশেকের একটি পুত্র সন্তান আছে ওর ডাক নাম টুকটুক আর ভালো নাম রক্তিম। সে এবারে ঢাকার নাম করা ইংরেজি মিডিয়ামে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। টুকটুকের লেখাপড়া নিয়ে তার বাবা – মা খুবই চিন্তিত কারণ ভালোভাবে ইংরেজি ভাষাটা আয়ত্ত করতে না পারলে সে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারবে না এবং কর্মজীবনেও ভালো জায়গাতে পৌঁছাতে পারবে না। তাই বাড়িতে থাকাকালীন যদি টুকটুক বাংলা বলে এতেও তাদের আপত্তি , কারণ লোকে শুনলে কি ভাববে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াচ্ছি বাংলা বলার জন্য নাকি অনর্গল ইংরেজি বল্লে তবেই না ইংরেজিতে পারদর্শী হবে। দশ বছরের ছেলে বাঙালী সংস্কৃতি কিছু না জানলেও ব্যস্ত সময়ের মধ্যেই তার বাবা – মা পশ্চিমা সংস্কৃতি ঠিকই শেখায়, না হলে যে তাদের সন্তান বর্তমান সময়ে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে না।

আজ টুকটুকের বড়ই আনন্দের দিন কারণ বেশ কয়েক বছর পর সে গ্রামে দাদার বাড়িতে বেড়াতে যাবে। এর আগে একবার গিয়েছিল সাত বছর বয়সে শীতের ছুটিতে। এবারের শীতের ছুটিতে সবাই মিলে ঘুরতে চলে গেলো।শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে টুকটুক ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা খাচ্ছে আর দাদাভাইয়ের সাথে কথা বলছে, Grandpa your village is so beautiful. And the cake is very delicious, thank you so much grandpa. তুমি আমার সাথে ও ইংরেজিতে কথা বলছো কেনো দাদুভাই,তুমি কি বাংলা বলতে পারো না? No grandpa, I can but my parents forbid me to talk in Bangla. তাই নাকি দাদুভাই! তুমি গল্প শুনতে পছন্দ করো তো? Yes grandpa,please tell me.   আচ্ছা দাদুভাই শোনো তাহলে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় উপমহাদেশে বিভক্তির আগেই আমার জন্ম তবে বয়স আমার খুব কম তখন হবে হয়তো ৭ কি ৮ বছরের মতো।দেশ ভাগের পর আমার বন্ধু নরেশ আমাদের বাড়ির পাশেই থাকতো, সে এদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। ফলে আমিও হয়ে পড়ি সাথীহারা তখন আমার সর্বক্ষণের সাথী হয় আমার মা। আমার মা খুব বেশি লেখা পড়া না জানলেও আমার প্রথম অ,ক,খ শেখা তাঁর কাছে থেকেই। লেখাপড়ার পর বাদবাকি সময় টুকু মা আমায় গল্প শোনাতেন।

আমিও খুব আনন্দের সাথে মায়ের গল্পের কল্পনায় হারিয়ে যেতাম। দেশ ভাগের পর থেকেই দেশে গোলযোগ চলতে থাকে।মাকে গল্প বলতে বললে, মা বলে ওঠে জানিস খোকা ওরা নাকি তোকে আর গল্প শুনতে দিবে না, বাংলা বলা নাকি এখন থেকে নিষেধ, উর্দু ভাষা শিখতে বলছে ওরা। তখন খেয়াল করলাম মায়ের চোখের কোণে পানি জমে গিয়েছে তা দেখে মাকে দু’ হাতে গলা জরিয়ে ধরে আমিও কেঁদে কেঁদে বল্লাম ওমা, মা ওরা যদি আর গল্প শুনতে না দেয় তাহলে আমি ঘুমাবো কেমন করে, তোমার গল্প না শুনতে পারলে আমি তো মরেই যাবো।তখন মা দু’ হাতে আমার মুখ চেপে ধরে বল্লেন ও কথা বলিস না খোকা, সন্তান হারানোর শোক যে কোন মা সহ্য করতে পারে না, এর থেকে কষ্টের এ পৃথিবীতে আর কিছু নেই।   কিছু দিন পরেই গ্রামে খবর এলো ঢাকায় বহু মানুষের উপর গুলি চালানো হয়েছে। তখন আমি তো অনেক ছোট রাজনৈতিক বিষয় না বুঝলেও গ্রামের চায়ের দোকানে বসা মাস্টার মশাইয়ের বলা কথাগুলো অর্থ ভালোভাবেই বুঝেছিলাম। তখন বাড়িতে এসে মালে জিজ্ঞেস করেছিলাম মা, ওমা তুমি না বলেছিলে সন্তান হারানোর শোক কোন মা সহ্য করতে পারে না।

তাহলে ঢাকায় যে শত শত মায়ের সন্তানকে গুলি করে মারা হয়েছে , তারা সহ্য করছে কেমন করে? জানিনা কেনো আমার প্রশ্ন শুনে মা সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল। আর আমায় উত্তর দিয়েছিলেন যাতে আমরা সবাই বাংলায় কথা বলতে পারি,যাতে তুই আমার গল্প শুনে ঘুমাতে পারিস। সেইজন্য ওদের মা এ শোক দুঃখ হাসি মুখে মেনে নিয়েছে । কারণ ওরা ভাষা শহীদ জননী,এ তাদের দুঃখ না গর্বের। ভাষার জন্য শহীদ হয়েছে তাঁদের সন্তান। দেখিস নাই তোর আয়েশা ফুপিকে তোর ওসমান ভাই ও তো মারা গেছে কিন্তু তার চোখে কোন পানি নাই। একি দাদুভাই তুমি কাঁদছো কেনো? Grandpa it’s very painful story. না না দাদুভাই এ আমাদের গর্বের ইতিহাস, অহংকারের ইতিহাস। সারা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র বাঙালীরাই বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। কিন্তু এই বাংলা ভাষা বলতে আমাদের যত লজ্জা হয়। আমার সন্তানকে হয়তো উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছি কিন্তু প্রকৃত মানুষ করতে পারিনি, দাদুভাই এরাই আমার দুঃখ। পাশে বসে থাকা পুত্র ও পুত্রবধু তাদের ভুল বুঝতে পারে আর বাবার কাছে ক্ষমা চায়, তাদের ভুল শুদ্ধরে নেওয়ার অঙ্গীকার করে।

পরের দিন ২১ শে ফেব্রুয়ারি ‘ ভাষা শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ‘ উপলক্ষে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টুকটুক ও তার বাবা – মা, দাদাভাইয়ের সাথে খালি পায়ে ভোর বেলা কয়েকটি লাল গোলাপের শ্রদ্ধা জানাতে যায়। ভাষা শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে টুকটুক ও তার বাা – মা অনেক কিছু শেখে।   এখন টুকটুক শুধু তার স্কুলের মধ্যেই ইংরেজি বলে।বাদবাকি সময় বাংলায় কথা বলে। টুকটুকের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার বিষয়ে তার বাবা – মা এখন বিশেষ যত্নশীল। টুকটুক এখন বাংলা বলতে, পড়তে ও লিখতে পারে আবার সুন্দর আবৃত্তি ও করে। টুকটুকের বাবা- মা ও এখন আর ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখে না।

সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়