ব্যাংকের কর্মচারীই এঁটেছিলেন পরিকল্পনার ছক: পুলিশের জ্বালে ধরা ৬ছিনতাইকারী
নওগাঁ প্রতিনিধি: গত মঙ্গলবার (৬অক্টোবর) নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার পারইল ব্রিজ এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার দুই কর্মকর্তাকে পিটিয়ে ৩৪লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এরপর ঘটনাটি টক অফ দি কান্ট্রিতে পরিণত হয়। ঘটনা উদঘাটনে মাঠে নামে জেলা পুলিশ।
অথচ সেই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীই ছিলেন ভিকটিমের রোলে থাকা রাসেল বাবু নামে ওই এজেন্ট ব্যাংক শাকার অফিস সহায়ক। আর ক্যাশিয়ার নাজমুল হয়েছিলেন তাদের প্রকৃত ভিকটিম। তাকেই পিটিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় ৩৪লাখ টাকা।
অবশেষে তিন দিনের অভিযানে দুই কর্মকর্তাকে মারপিট করে ৩৪লাখ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী তিন ব্যাংক কর্মীসহ ৬জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সেই সাথে তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ১লাখ ৪২ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল এবং ৭টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার দিন ৬ থেকে ৮অক্টোবর পর্যন্ত নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনলাইন জুয়ায় হেরে কর্মরত ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনার ছক এঁটেছিলেন গ্রেপ্তার তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীই।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তদারকিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও রাণীনগর থানা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত চৌকস টিম তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, রানীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮) একই গ্রামের ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), ইসলামী এজেন্ট ব্যাংকয়ের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী অলংকার দিঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (২৭), সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২) ও অফিস সহায়ক অলংকার দিঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেল মালিক রাব্বি আলী।
শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, গত ৬অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মচারী ক্যাশিয়ার এবং অফিস সহায়ক আদিমদিঘী রেল গেট হতে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে তার মালিক ফিরোজ হোসেনের আবাদপুকুর বাজার শাখার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল যোগে রওনা দেয়। বেলা ১টার দিকে রানীনগর উপজেলার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পিছন থেকে একটা মোটরসাইকেল তাদের পথ রোধ করে এবং লোহার স্টিক দিয়ে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে ওইদিন রাত ১১টার দিকে জেলা গোয়েন্দা শাখার চৌকস টীম ও রানীনগর থানা পুলিশ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত ও তথ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রাথমিক ক্ল্যু উদঘাটন করতে সক্ষম হয়। এবং প্রাথমিক পর্যায়ে দুই জন আসামি সনাক্ত করে ঘটনার রাতেই অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যাবহৃত রেজিষ্ট্রেশন বিহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ এবং মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসপি আরও জানান, ঘটনার একদিন পর ৭অক্টোবর রাতে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি স্পেশাল টীম জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর ও দিনাজপুর জেলায় অভিযান পরিচালনা করে। এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইয়ের ঘটানার সাথে জড়িত স্বপন এবং হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ১লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের দেয়া তথ্য মতে ৮অক্টোবর রানীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে আসামি ইসলামী এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা ও এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় আসামি ব্যাংকের অফিস সহায়ক রাসেল, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস যাবত অনলাইন জুয়া খেলে প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা হেরে যায়। তখন তারা বিভিন্ন গ্রাহকদের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়া খেলায় ব্যবহার করে এবং হেরে যায়। এরপর তারা তিনজন গ্রেপ্তারকৃত অপর ছিনতাইকারী স্বপন, হাসানসহ কয়েকজন মিলে এজেন্ট ব্যাংকের মালিক মোঃ ফিরোজ হোসেনের টাকা ডাকাতির পরিকল্পনা করে। তারা দীর্ঘ একমাস যাবত এই পরিকল্পনা করতে থাকে।
তিনি আরও বলেন, সেই পরিকল্পনা মোতাবেক ঘটনার দিন অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ব্যাংকের ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সাথে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে টাকা আনতে যায়। টাকা নিয়ে অফিসের দিকে যাবার সময় আসামি রাসেল বাবু, স্বপন এবং হাসানসহ পলাতক আসামিদের তাদের অবস্থান জানাতে থাকে। ঘটনা স্থলে টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে নাজমুল ও আসামি রাসেল পৌঁছালে স্বপন এবং হাসানসহ পলাতক কয়েকজন তাদেরকে আটকিয়ে মারধর করে এবং টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ক্যাশিয়ার নাজমুল ছিল প্রকৃত ভিকটিম, তাকে লোহার পাইপ দিয়ে বেশ মারধর করা হয়। অন্যদিকে টাকা বহনকারী অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ছিল সাজানো এবং মিথ্যা ভিকটিম।
পুলিশ সুপার বলেন, ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকের তিনজন ১০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সকল ছিনতাইকারীরা মিলে বাকি টাকা নেওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে ছিনতাইকারী স্বপন এবং হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লক্ষ টাকা দেওয়া হয় এবং তাদেরকে নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। সেই মোতাবেক ছিনতাইকারী হাসান ও স্বপন জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুর পালিয়ে যায়। সকল আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হবে।
এদিকে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ আবাদপুকুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার স্বত্বাধিকারী ফিরোজ হোসেন জানান, আমি বিশ্বাস করে তাদেরকে চাকরি দিয়েছিলাম। তারাই আমার চরম ক্ষতি করল। তবে পুলিশ সুপার খুব দ্রুত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এখন শুধু এসপি স্যারের প্রতি অনুরোধ থাকবে আমার ছিনতাই হওয়া টাকা যেন দ্রুত উদ্ধার করে। তাছাড়া আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি আশা করি এসপি স্যার খুব দ্রুত টাকাগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন।
সংবাদ সম্মেলনে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ আল মামুন, জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক (ওসি ডিবি) হাসিবুল্লাহ হাসিব, নওগাঁ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান, রানীনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) জাকারিয়া মন্ডলসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তরা উপস্থিত ছিলেন।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।