শাসক বদলেছে, শোষণের ধারা বদলায়নি : শফিকুর রহমান
সংবাদের আলো ডেস্ক: দেশে শাসক বদলেছে, তবে শোষণের ধারা বদলায়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
তিনি বলেন, আমরা চাই, দেশে গণতন্ত্রের ধারা প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু একটি দল নির্বাচিত হয়েই বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসন নিয়োগ দিচ্ছে। জনগণের রায়কে অমান্য করার চেষ্টা করছে।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আয়োজনে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যপরিষদ সদস্য ও দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা, চিরকাল অম্লান থাকুক এই মহিমা’ শীর্ষক স্লোগানে আয়োজিত আলোচনা সভা পবিত্র কুরআন থেকে তিলওয়াতের মাধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপরে ঢাকা মহানগর শিল্পীগোষ্ঠীর গাওয়া গানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরবর্তীতে আমন্ত্রিত বক্তারা একে একে বক্তব্য দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী একটি দল সরকারে থাকবে, আরেকটি দল বিরোধী হবে। সরকার ঠিক করলে সরকারকে সহযোগিতা করবে, আর ঠিক না করলে বিরোধিতা করবো। আমরা গণতন্ত্র অনুযায়ী সরকারের সব ভালো কাজে সহযোগিতা করবো। আর জনগণের বিরুদ্ধে যে সিটি নেয়ার চেষ্টা হবে কঠিন ভাষার তা প্রতিহত করবো।
তিনি বলেন, আমরা যদি এই সরকারের ব্যর্থতা চাইতাম, তাহলে এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতাম। আমরা চাই সরকার সফল হোক। কিন্তু সরকারই যদি উল্টো পথে হাটে তাহলে আমাদের তো কিছু করার থাকবে না।
সরকারকে সঠিক পথে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আসুন, জনগণের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করি। শুনুন এ দেশের মানুষ কি চায়। যদি জুলাই সনদ মেনে নেয়া না হয় তাহলে হাদি হত্যা বিফল যাবে, ফেলানী হত্যা বিফলে যাবে, আবরার ফাহাদ হত্যা বিফলে হবে। দেশের জনগণ এটি কখনো হতে দিবে না।
তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা জনরায়কে মূল্যায়ন না করে এ দেশে লুণ্ঠন করেছিল। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছিল। আমাদের লড়াকু যোদ্ধারা তাদের পরাজিত করে একটি স্বাধীন পতাকা অর্জন করেছিল। আপনারাও যদি জনরায়কে মেনে না নেন, তাহলে আমাদের তরুণরা কঠিন ভাষায় তার জবাব দেবে।
তিনি বলেন, পাকিস্তানকে গণরায় না মেনে খেসারত দিতে হয়েছিল। আপনারাও জনগণের রায় মেনে না নিলে জাতী ছেড়ে দেবে না। আমরা সংসদে ও বাইরে এর জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, স্বাধীনতা একটি দেশের জন্য কত বড় অর্জন, এটি স্বাধীন দেশের মানুষ বুঝে না। যারা পরাধীন তারাই এটির মূল্য বেশি বুঝতে পারে। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেও কেন মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারলাম না, এর পেছনে রয়েছে দুর্নীতি-অনিয়ম। আমাদের এই দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে।
দেশের মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদ আত্মগোপনে গুহায় লুকিয়েছিল। এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দেশবাসীকে সচেতন থাকতে হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, আমি একজন তরুণ ক্যাপ্টিন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তার অন্যতম কারণ ছিল বৈষম্য, সুশাসনের অভাব। আমি মুক্তিযুদ্ধের আগে দলীয়করণ দেখেছি। এখনও আমাদের দেশে সরকার ও সরকার দলীয় মানুষ ছাড়া সাধারণরা বৈষম্যহীন সেবা পাচ্ছে না। তাই তারা জনগণের রায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারা ঘরিমসি করছে।
তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও প্রসিদ্ধ হওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে। আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জাতীর কাছে প্রসিদ্ধ হতে পারেন। জনগণের রায়ের বিপক্ষে হাঁটবেন না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জনগণের রায় মেনে নিন।
তিনি আরও বলেন, আপনারা যদি জুলাই সনদ না বুঝেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রফেসর নিয়ে জুলাই সনদ বুঝে নেন। তাও যদি না পারেন, তাহলে আমার ঘরে আসেন, আমি বুঝিয়ে দেব। কিন্তু জুলাই সনদে আপনারা যেহেতু স্বাক্ষর করেছেন, এটি আপনাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো দেশের স্বাধীনতার সংগাম হয় মানুষের বৈষম্য, শোষণের অবসান ঘটাতে। আমরা ৯ মাসের যুদ্ধে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা কেবলমাত্র এই একবারই স্বাধীনতা সংগ্রাম করিনি। আমাদের তিনবার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমাদের প্রথমে ব্রিটিশদের সঙ্গে স্বাধীনতার লড়াই করতে হয়েছে। পরে ১৯৪৭ সালেও একবার স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে হয়েছিলো। সর্বশেষ ১৯৭১ সালে ৯ মাসে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা পাই।
তিনি বলেন, আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছরে পা দিলেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এজন্যই ২০২৪ সালে আবারও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রক্ত ঝড়াতে হয়েছে। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলো ২০২৪ সালের স্বাধীনতায় যে অঙ্গীকার দেওয়া হয়েছিল, সেটি থেকেও সরকার দল এখন দূরে সরে দাঁড়াতে চাচ্ছে। এখন তারা ৩৬০ ডিগ্রি উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা সব ভালো কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবো। সব খারাপ কাজে বিরোধিতা করবো। কতবার এই জাতিকে রক্ত দিতে হবে? আমরা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় ততবার রক্ত দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পরও সেটি বাস্তবায়ন কেন করতে চাচ্ছে না, সেটি জাতির কাছে এখন অস্পষ্ট। তারা তো জুলাই সনদ মেনে নিয়েই গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনে এসেছিলেন। কিন্তু এখন তারা জনগণের রায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমরা জনগণের পক্ষে রয়েছি, জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়বো।
তিনি বলেন, আমরা বুঝতে পারছি যে, বিএনপির পরামর্শেই জুলাই সনদ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। আমরা চাটুকারিতার বাংলাদেশ চাই না। আমরা চাই জনগণের রায়ের ভিত্তিতে ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ। সেই ন্যায় প্রতিষ্ঠায় রাজপথে নামতে হলেও আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক নাটক হয়েছিল। জামায়তে ইসলামীকে নিয়ে অনেক নাটক সাজানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আগস্টে সব নাটকের পরাজয় ঘটিয়েছে এ দেশের জনগণ।
তিনি বলেন, যারা ২৪-কে ব্যর্থ করতে চান, তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, আমরা ২৪-কে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেব না। আমরা জুলাই সনদকে বিলীন হতে দেব না। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদের ভেতরে এবং আমরা বাহিরে থেকে আমাদের লড়াই চালিয়ে যাব। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, বিকল্প নেই।
পটুয়াখালী-২ বাউফল আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনয় আলোচন সভায় আরও বক্তব্য দেন শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ঢাকা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন, প্রমুখ।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।