বান্দরবানে প্রত্যাবর্তনকৃত বম সম্প্রদায়ের মাঝে ত্রাণ সহায়তা প্রদান সেনাবাহিনীর
আব্দুল আওয়াল আলিফ, বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুং সুং পাড়া আর্মি ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনায় মোট ৩১টি প্রত্যাবর্তনকৃত বম পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। দুই দিনব্যাপী ২৬ ও ২৭ নভেম্বর এ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়।
২০২১–২০২২ সালে কেএনএফ সশস্ত্র গোষ্ঠীর নির্যাতন, হুমকি ও অমানবিক পরিস্থিতির কারণে বহু বম পরিবার তাদের শতবর্ষের বসতি ছেড়ে বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার খোঁজে পাহাড়ের গহিন অরণ্যসহ বিচ্ছিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ সময় পরিবারগুলো উদ্বেগ–উৎকণ্ঠার মধ্যে নিজেদের বাড়ি–ঘর, যৌথ সম্পদ ও জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবিকতার হাত বাড়িয়ে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে এবং নিরাপদ জীবনে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখায়।
সদর দপ্তর ২৪ পদাতিক ডিভিশন, সদর দপ্তর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড এবং বান্দরবান রিজিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সেনা সদস্যরা পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তুচ্যুত পরিবারকে নিজ নিজ পাড়ায় ফেরানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও সাহস জোগানোর ফলে ধীরে ধীরে মানুষ তাদের পূর্বপুরুষের পাড়ায় ফিরে আসে এবং শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সংগ্রাম।
দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে দার্জিলিং পাড়ায় ১১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ২২টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়। পরবর্তীতে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আরও ৩টি পরিবার সেখানে ফিরে আসে। একই ধারাবাহিকতায় ২৯ জুন ২০২৫ তারিখে সুং সুং পাড়ায় অতিরিক্ত ৬টি পরিবার নিরাপদে বসবাসের সুযোগ পায়। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৩১টি পরিবার আবার নিজেদের শিকড়ে ফিরে এসে বসতি গড়ে তুলেছে—যা নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জন্য একটি বড় ইতিবাচক অর্জন।
অনেক দিন ধরে পাড়া জনশূন্য থাকায় কৃষিকাজের প্রধান মাধ্যম জুম চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং আবাদযোগ্য জমি জঙ্গলে ঢেকে যায়। ফলে জুম ক্ষেত পুনরুদ্ধার ও জীবন–জীবিকা স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনীর নিয়মিত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুনর্বাসনের শুরু থেকে সুং সুং পাড়া সেনা সাব–জোন ধারাবাহিকভাবে খাদ্যসামগ্রীসহ বিভিন্ন মৌলিক সহায়তা পাড়াবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।
২৬–২৭ নভেম্বর পরিচালিত সাম্প্রতিক ত্রাণ বিতরণে সুং সুং পাড়া ও দার্জিলিং পাড়ার মোট ১৩৫ জন মানুষের হাতে সেনা সদস্যরা খাদ্যসহায়তার প্যাকেট পৌঁছে দেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে প্রতিটি পরিবারের কাছে গিয়ে সরাসরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর আন্তরিকতা ও মানবিক অবস্থান আবারও প্রমাণিত হয়। এ সময় আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার, সংশ্লিষ্ট কারবারি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পাড়াবাসীদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় সেনাবাহিনীর প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা ও আস্থা। তারা জানান, বিপদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে এবং নতুন ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা যোগায়।
ত্রাণ প্রদানের পাশাপাশি ক্যাম্প কমান্ডার পরিবারগুলোর জীবনমান, প্রয়োজন, অভিযোগ ও চলমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন এবং সমাধানের আশ্বাস প্রদান করেন। পাড়াবাসীদের প্রত্যাশা—সেনাবাহিনী ও জনগণের যৌথ অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ আরও নিরাপদ, স্বাবলম্বী ও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে। তাদের বিশ্বাস, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও উন্নয়নের এই ধারাবাহিক উদ্যোগ পাহাড়কে আরও বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ করে তুলবে।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।