কিডনি দিবে বাবা মা, নেই প্রতিস্থাপনের টাকা: মৃত্যুর মুখে যুবক নজরুল
নুরুল ফেরদৌস লালমনিরহাট: দুইটা কিডনি নষ্ট হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ২২ বছরের যুবক নজরুল ইসলাম। একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে কিডনি দিতে প্রস্তুত বাবা মা। বাঁধা শুধু প্রতিস্থাপনের খরচের ১৫ লাখ টাকা। নজরুল ইসলাম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া দেওয়ানী বাজার তিস্তা নদীপাড়ের মোজাহার আলী নর্গিস দম্পতির একমাত্র ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, যুবক নজরুল ইসলামের জন্ম হয় মলদ্বাড় তথা পায়খানার রাস্তা ছাড়াই। যার কারনে জন্মের মাত্র ৫ দিনের মাথায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালিন চিকিৎসক ডা. হাসানুজ্জামান শাহীন দুই দফায় অপারেশন করে মলদ্বাড় স্থাপন করেন। অপরাশেন শেষে পায়খানার পথ ঠিক হলেও বন্ধ হয়ে পড়ে প্রসাব নালীর পথ। বিরতিহীন ভাবে নির্গত হতে থাকে প্রসাব। এভাবে ওষুধে কেটে যায় ৭/৮ বছর। ধিরে ধিরে নজরুল দুর্বল হতে থাকে। প্রচন্ড অসুস্থ হলে এক পর্যায়ে তাকে ভর্তি করা হয় দেশের সর্বচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল বিশ্বিদ্যাল পিজিতে। সেখানে দীর্ঘ সময় ভর্তি থেকে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসা দেয়া হয়। অনেক ভাবে চিকিৎসকদের দুয়ারে ঘুরেও কেউ প্রসাবের রাস্তাটা ঠিক করতে পারেননি। ছেলের চিকিৎসার জন্য সপরিবারে ঢাকা কেরানিগঞ্জে বসতি গড়েন তারা। সেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে সংসার আর ছেলের চিকিৎসা করান মোজাহার।
ওষুধের উপরেই কেটে যায় আরও প্রায় ১০ বছর। অবিরাম প্রসাব নির্গতও বন্ধ হয়নি। যা ক্রমে কিডনিকে দুর্বল করে ফেলে। তাকে জাতীয় কিডনি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিডনি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শরীফ কমরুদ্দীনের তত্ত্বধানে তার চিকিৎসা চলছে। অবশেষে দীর্ঘ ২২ বছর পরে চিকিৎসকরা জানালেন নজরুলের দুটা কিডনি বিকল হয়েছে। বাম পাশের কিডনি মাত্র ৪.৮০% ও ডান পাশে ৩.৩২% সচল রয়েছে। যা ক্রমে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে মোজাহার নার্গিস দম্পতির একমাত্র আদরের ছেলে নজরুল ইসলাম।
দীর্ঘ ২২ টি বছর ছেলের চিকিৎসা করাতে নিঃশ্ব এ দম্পতি, বিক্রি করেছেন জায়গা জমিসহ সকল সম্পত্তি। ছেলেকে সুস্থ্য করতে গ্রামের জমি জমা শেষ করে স্থানীয়দের সহায়তা নিয়ে শেষ প্রান্তে এসে নিজেদের কিডনি দিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া মোজাহার নার্গিস দম্পতি। কিন্তু প্রধান অন্তরাত কিডনি প্রতিস্থাপনের টাকা। চিকিৎসকদের মতে, নজরুলকে বাঁচাতে দ্রুত ভারতে নিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। এ খবরে দিশেহারা গরিব বাবা মা। সন্তানকে বাঁচাতে নিজেরা কিডনি দিতে রাজি হলেও ভারতে গিয়ে প্রতিস্থাপনে ১৫/১৬ লাখ টাকা দরকার। যা জোগার করা তাদের পক্ষ অসম্ভব। নাড়ি ছেড়া ধন নজরুলকে বাঁচাতে সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্য দাবি করেন নজরুলের বাবা মা ও স্থানীয়রা।
প্রতিবেশী মাহমুদুন্নবী বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে বিদ্ধস্থ। নজরুলকে বাঁচাতে গরিব গ্রামবাসী দীর্ঘ দিন ধরে সহায়তা করে আসছে। এখন ভারতে নিতে প্রয়োজন প্রায় ১৫/১৬ লাখ টাকা। যা জোগার করা ওই পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আমরা বিভিন্ন স্থানে হাত পেতে তার চিকিৎসার জন্য তহবিল গঠন করতেছি। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন তিনি।
নজরুলের সহপাঠি আশরাফুল বলেন, নজরুল আমাদের বয়সী। জন্ম থেকে সে অসুস্থ। আমরা খেলতে গেলে সে খেলতে না পেয়ে অপলক তাকিয়ে থাকত। আমাদের খুব কষ্ট হত। আমরা গ্রামবাসীর কাছে সহায়তা নিয়ে ও তার বাবার সামান্য আয়ে দীর্ঘ প্রায় ২২টি বছর ধরে তার চিকিৎসা চলে। এখন তো কিডনি প্রতিস্থাপনে এক সঙ্গে অনেক টাকা লাগবে। যা জোগার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, নজরুলের বাঁচার আঁকুতি আমাদেরকে ভিষন ভাবে নাড়া দেয়। বন্ধুকে বাঁচাতে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
নজরুলের প্রতিবেশী উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব একেএম হাসানুল হক বান্না বলেন, নজরুলের চিকিৎসা করাতে পরিবারটি আজ নিঃশ্ব হয়ে পড়েছে। দুটা কিডনি নষ্ট হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে নজরুল। তাকে বাঁচাতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম কান্নাজরিত কন্ঠে বলেন, আমি বাঁচতে চাই, আমাকে বাঁচান। দিন যত গড়াচ্ছে আমার কিডনি ততই দুর্বল হচ্ছে। আমি বাঁচতে চাই। আমার জন্য সাহায্য করুন, আল্লাহর কাছে দুয়া করুন।
নজরুলের মা নার্গিস বেগম বলেন, জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর ধরে ছেলের প্রসাব পরিস্কার করছি। দেশের এমন কোন হাসপাতাল নেই যেখানে তাকে নিয়ে যাইনি। এসব করতে জমি জায়গা সব শেষ করেছি। নাড়ি ছেড়ে ধন যখন বাঁচার আঁকুতি জানায়, তখন আমি মা হয়ে তার জন্য সর্বস্য দিয়ে চেষ্টা করছি। মানুষের কাছে হাত পেতে তার চিকিৎসা করেছি। আমি মারা গেলেও কষ্ট নেই তবুও আদরের ধন বেঁচে থাকুক। এজন্য আমি কিডনি দিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু এটি প্রতিস্থাপনের টাকা আমাদের নেই। সমাজের বিত্তবানরা যদি সাহায্য করত আমার ছেলেটা বেঁচে যেত।
বাবা মোজাহার আলী বলেন, ছেলেকে উন্নত চিকিৎসা দিতে নিজে পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেছি। ক্ষুদ্র ব্যবসায় যা আয় হত তা ও সমাজের মানুষের দানে এতদিন চিকিৎসা করালাম। এখন ভারতে নিতে অনেক টাকা লাগে। যা আমার পক্ষে জোগার করা অসম্ভব। একদিকে টাকা অন্যদিকে একমাত্র ছেলের বাঁচার আঁকুতি আমাকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। শেষ সময়ে এসে টাকার কাছে হারতে বসেছি। তাই ছেলেকে বাঁচাতে বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন তিনি।
নোট ঃ (নজরুলের বাবা মোজাহার আলীর নম্বর ০১৯৬২১৭৮০৫৫) ।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।