বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

মে মাসেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে বাংলাদেশ

সংবাদের আলো ডেস্ক: আগামী মাসেই (মে ২০২৬) সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করলেও কোন প্রতিষ্ঠানেই জমা দেয়া হয়নি। যে কারণে পরিত্যাক্ত করা হয় ২০২৪ এর বিডিং রাউন্ড।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ওই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, আমরা প্রস্তুত, সরকারের সিগন্যালের অপেক্ষা করছি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ১৯ এপ্রিল সংসদে বলেছেন, গভীর ও অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে নতুন গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হবে। শিগগিরই নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ অফসোর বিডিং রাউন্ড ২০২৪-এর অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের পিএসসি (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) পর্যালোচনার ভিত্তিতে মডেল পিএসসি ২০২৩’ হালনাগাদ করার লক্ষ্যে খসড়া প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে। প্রণীত খসড়ার উপর লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। প্রণীত খসড়া ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদনের পর হালনাগাদকৃত পিএসসি’র আওতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে নতুন গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

সর্বশেষ মডেল পিএসসি-২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মার্কিন কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল, ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলা থেকে ডাটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দরপত্র জমাদানের সময় পিছিয়ে যায়। 

অন্তবর্তীকালীন সরকার কারণ উৎঘাটন কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইনের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করাসহ বেশকিছু বিষয় সংশোধন করা হয়েছে।

মডেল পিএসসি-২০১৯ থেকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ অনেক ছাড় দিয়ে পিএসসি-২০২৩ চুড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয় ব্রেন্ট ক্রডের ১০ শতাংশ দরের সমান। যা আগের পিএসসিতে যথাক্রমে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে ৫.৬ ডলার ও ৭.২৫ ডলার স্থির দর ছিল। মাডেল পিএসসি ২০২৩ এর মতোই সংশোধনীতেও কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। অথচ অতীতে খসড়া উন্মুক্ত করে জনগণের মতামত নেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখানে আগের সরকারের পথেই পরিচালিত হচ্ছে নতুন সরকারও।

আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মায়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের। সেই সম্ভাবনাময় সাগরাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে বিগত সরকার। একই পথেই হেঁটেছে অন্তবর্তীকালীন সরকারও। যে কারণে অধরাই থেকে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় জলরাশি। বাংলাদেশের পাশের অংশ থেকে মায়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস উত্তোলন করছে। যে কারণে বাংলাদেশে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক আছে। ২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ জন্য আমেরিকান কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। কনোকো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ কিছু শর্ত সংশোধনের আবেদন করে। বাংলাদেশ সেই শর্তে সাড়া না দিলে ২০১৪ সালে ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে অফসোর বিডিং রাউন্ড ২০১২ আওতায় ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড এসএস-৪ ও এসএস-৯ এর চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ওএনজিসি ভিদেশ কাঞ্চন-১ কূপ খনন করেছে, আরও দু’টি অনুসন্ধান কূপ খনন করবে। ২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে ব্লক ফেল চলে যায় পসকো দাইয়ু। ২০২৪ সালের আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসি আপডেট করা হলেও দরপত্র ডাকা হয়নি। কয়েক মাসের কাজ পিএসসি (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) আপডেট করতেই ৫ বছর সময় পার করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। 

মডেল পিএসসি ২০০৮ প্রণয়ন কমিটির প্রধান মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, অনেকে মনে করেছিলেন গ্যাসের দাম বাড়ালেই কোম্পানিগুলো দৌড়ে আসবে। সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেনো জমা হয়নি সেটা তালাশ করার পাশাপাশি কেনো মাত্র ৭টি কোম্পানি দরপত্র কিনেছে সেটাও দেখা দরকার। পিএসসিতে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে, এখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে দৈনিক ২০ হাজার ব্যারেল (তেলের সমান) গ্যাস উত্তোলন করে এমন কোম্পানি দরপত্র কিনতে পারবে। এখানেইতো অনেক কোম্পানি বাদ পড়ে গেছে। আমি মনে করি গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০ হাজার এবং অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ৫ হাজার ব্যারেল হওয়া উচিত। তাহলে আরও অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিতে পারবে।

তিনি বলেন, আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ডাটা প্যাকেজের দাম অনেক বেশি। কোন কোন প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারের মতো। অন্য দেশে এসব ডাটা ফ্রি দেয়। ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে এসব ডাটা উন্মুক্ত ছিলো, তখন অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছিলো।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে দৈনিক অনুমোদিত লোড রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, প্রকৃত চাহিদা ধারণা করা হয় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, আর ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়নের মতো। বেশি চিন্তার হচ্ছে প্রতিনিয়ত দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ন্ত রয়েছে চাহিদা। এক সময় ২৮০০ মিলিয়ন উৎপাদন হলেও এখন ১৭০০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ বিবেচনা করা হয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে। অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে মনযোগ বেশি ছিল বিগত সরকারগুলোর।

স্থলভাগে কূপ খনন করেও বড় রিজার্ভ পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ানো থাকল দুরের কথা বর্তমান উৎপাদন ১৭০০ মিলিয়ন অব্যাহত রাখাই কঠিন মনে করা হচ্ছে। একমাত্র ভরসা হচ্ছে গভীর সমুদ্র, সেখানে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে খাদের কিনারে থাকা জ্বালানি খাতে মহা বিপজ্জয়ের শঙ্কা দেখছেন অনেকেই।

সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়