পাবনা-৩: নির্বাচনের আগে উত্তপ্ত রাজনৈতিক মঞ্চ, প্রার্থী নিয়ে টানাপড়েন
সঞ্জিত চক্রবর্তী, পাবনা প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে দেশের রাজনীতিতে। ভোটের তারিখ এখনো ঘোষণা না হলেও, পাবনা-৩ আসনে নির্বাচনী উত্তেজনা ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ চূড়ায়। মাঠে নেমে পড়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা, চষে বেড়াচ্ছেন পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার ও গ্রামের পর গ্রাম। চলছে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি, চলছে মনোনয়ন ও জনগণের আস্থা অর্জনে এক অনুপম প্রতিযোগিতা।
পাবনা-৩ আসন গঠিত চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে। তিনটি পৌরসভা ও ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬০১ জন। এর মধ্যে এককভাবে চাটমোহরেই রয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩৯ জন ভোটার—অর্থাৎ মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি।
ফলে প্রার্থীদের দৃষ্টি এখন চাটমোহরের দিকেই। এই আসনে দলীয় প্রতীকের পালাবদল হয়েছে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে। স্বাধীনতার পর প্রথম এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক সমাজী।
এরপর বিএনপির কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের ওয়াজি উদ্দিন খান, জাতীয় পার্টির খবির—এভাবেই বারবার বদলেছে নেতৃত্ব। তবে ২০০৮ থেকে টানা তিনবার এখানে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের মো. মকবুল হোসেন। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির স্থানীয় নেতারা যেমন আশাবাদী হয়ে মাঠে নেমেছেন, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও।
চাটমোহরের সাবেক এমপি কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা, বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা হাসানুল ইসলাম রাজা এবং ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাইফুজ্জামান সেলিম—সকলেই মনোনয়নপ্রত্যাশী। এদের মধ্যেই হঠাৎ আলোড়ন তোলে বিএনপি কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের নাম। পাবনা-২ আসনের সঙ্গে তাকে পাবনা-৩ এর দায়িত্বও দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে।
এখানেই শুরু হয় অসন্তোষ, প্রশ্ন ওঠে—স্থানীয় প্রার্থীদের উপেক্ষা করে একজন বহিরাগত কেন? এই ঘোষণার পরপরই নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কেউ তুহিনের নৈকট্য পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, কেউ আবার নিজের এলাকার প্রার্থীর পক্ষেই জোর সওয়াল করেন।
তৃণমূল পর্যায়ে শোনা যাচ্ছে নানা স্লোগান—”তুহিন ভাইয়ের সালাম নিন, ধানের শীষে ভোট দিন”, আবার কোথাও উচ্চারিত হচ্ছে—”দাবি মোদের একটাই, চাটমোহরের প্রার্থী চাই!” চাটমোহরবাসীর মাঝে দীর্ঘ ১৭ বছর এমপি না থাকার আক্ষেপ প্রকট। তাই এবার তারা একাট্টা হয়ে চাইছেন চাটমোহরের সন্তানকেই এমপি হিসেবে দেখতে।
এতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সম্ভাবনা। বলা হয়ে থাকে, এ আসনে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫%। বাকি ৮৫% জনসাধারণের ভোটের উপরই নির্ভর করে ফলাফল। ফলে কেউ কেউ বলছেন—যদি চাটমোহর উপজেলা থেকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কোনো প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে ভোটে নামেন, তাহলে সারা খেলাই বদলে যেতে পারে।
কোন পথে যাবে নির্বাচন? এই মুহূর্তে পাবনা-৩ রাজনৈতিকভাবে চরম দোলাচলে। জামায়াত ও খেলাফত মজলিস ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও পুরনো ঘরেই ভরসা রাখার আভাস।
অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে দলীয় প্রার্থীর ঘোষণা ঘিরে বাড়তে পারে বিদ্রোহ ও ছিটকে পড়া। তবে রাজনৈতিক কৌশল ও মাঠের বাস্তবতা মিলিয়ে অনেকে বলছেন—হাসান জাফির তুহিন যদি মাঠে নিজের প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখতে পারেন, তবে হয়তো শেষ পর্যন্ত বিএনপি তাকেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবে। এ অবস্থায় নতুন সম্ভাবনার জন্ম নিচ্ছে: যদি তিনি জয় পান, তাহলে এই আসন থেকেই দেশের রাজনীতিতে নতুন এক মন্ত্রী জন্ম নিতে পারেন। ভোটের তারিখ যতই এগোচ্ছে, ততই জমছে পাবনা-৩ এর রাজনীতি।
প্রতীক নয়, এবার মানুষ চায় প্রার্থী—যোগ্য, স্বচ্ছ, গণমুখী এক প্রতিনিধি। এখন দেখার বিষয়, কোন মুখে ভরসা রেখে ভোটের বাক্সে সিল পড়বে।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।