রাজস্ব আদায়ের নামে তুঘলকি কারবার রেলের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার
লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাট রেলওয়ের জমির রাজস্ব আদায়ের নামে চলছে তুঘলকি কারবার। বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ মনজুর হোসেন নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অফিসে বসেই করছেন লাইসেন্স বাণিজ্য। সম্প্রতি কয়েকদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন একাধিক অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র। তবে ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগ তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ৮ টি জেলার ৮৪টি স্টেশন এলাকা লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের আওতায়। আর এসব জায়গায় দীর্ঘদিন থেকে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শত শত দোকানপাট। ভুক্তভোগী অনেকের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযানের কথা বলে এসব দোকানপাটে তালা মেরে এবং সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করে বাণিজ্যিক লাইসেন্স প্রদানের নামে অফিসে বসেই মোটা অংকের ঘুষ নিচ্ছেন রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন। পাশাপাশি এসব লাইসেন্স প্রদান বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক রেলওয়ের লাইসেন্স ফি বাবদ সকল রাজস্ব এ-চালানের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকে জমা নেয়ার নিয়ম এবং এ উদ্দেশ্যে যে কোন প্রকারের নগদ অর্থ লেনদেন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়াও, বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০ মোতাবেক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক লিজ বা লাইসেন্স অনুমোদিত হওয়ার পর সরকারি পাওনাদি আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ ইস্যু করার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অফিসের এক সংশ্লিষ্ট সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার রনিউল ইসলাম, ফজলে রহমান নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি রাজস্ব আদাযের কথা বলে অফিসে বসেই মনজুর হোসেন নিজ হাতে নগদ অর্থ গ্রহণ করেন যথাক্রমে ১ লক্ষ ২৫ হাজার এবং ৮৪ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি নিজ অফিসের কর্মচারীর মাধ্যমে লালমনিরহাটের মিশন মোড় শাখার অগ্রণী ব্যাংকে ৬টি সরকারি এ-চালানের মাধ্যমে যথাক্রমে ৫৩ হাজার এবং ৩৬ হাজার টাকা জমা প্রদান করেন। তারপর মনজুর হোসেন তাদের হাতে ধরিয়ে দেন ভূয়া বাণিজ্যিক লাইসেন্স, আদতে যা রেলওয়ে এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামক সফটওয়্যারে এন্ট্রিকৃত তথ্যের কপি মাত্র। বার বার সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেয়ার রশিদ চাইলেও ভুক্তভোগীদের দেয়া হয়নি কোনো রশিদও। এ লাইসেন্স তিনি কিভাবে ইস্যু করেছেন এ সংক্রান্ত নথিপত্র দেখাতে বললেও তিনি তা দেখাতে পারেননি।
রনিউল ইসলাম বলেন, “গত কয়েকদিন আগে ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন অফিসের কর্মচারীদের নিয়ে বড়খাতা রেল স্টেশন এলাকায় আসেন। সেখানে কয়েকজনের দোকানে তালা মারেন এবং অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। অফিসে এলে তারা আমাকে আমার ৪৯২ বর্গফুট জমির জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিতে বলে। আমি নগদ অর্থের সেই টাকা মনজুর হোসেন এর হাতে তার অফিসে দেই। এর কিছুক্ষণ পরে তিনি আমাকে একটি অনলাইন কপির একটি কাগজ দেন। সেখানে কোন টাকার পরিমাণ উল্লেখ ছিল না। পরে আমি জানতে পারি আমার নামে অগ্রণী ব্যাংকে তিনটি চালান এর মাধ্যমে মাত্র ৫৩,১৯৭/ টাকা জমা দেয় হয়েছে। বার বার বললেও তিনি আমাকে কোনো রশিদ দেননি। এভাবে আমাদের এলাকার অনেকের কাছে তিনি টাকা নিলেও কাউকে রশিদ বা কোনো চালানের কপি দেননি। অফিসে বসেই তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা নিচ্ছেন। অল্প কিছু টাকা জমা করলেও বাকি টাকা তিনি আত্মসাত করছেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান উচ্ছেসসহ মামলা করারও হুমকি দেন তিনি।”
একই এলাকার ফজলে রহমানের অভিযোগ একই রকমের। তিনি জানান, তার কাছে ৮৪ হাজার টাকা নেয়া হলেও ব্যাংকে তার নামে জমা হয়েছে মাত্র ৩৫,৭০১/ টাকা। রনিউল ও ফজলের মত অনেকের কাছ থেকেই একই উপায়ে টাকা নেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী রনিউল ও ফজলে রহমানের বিষয়ে মানা হয়নি রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো বিধি। এমনকি লাইসেন্সের ধরণ পরিবর্তন এবং জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়াও মানা হয়নি তাদের ক্ষেত্রে।
অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও একইভাবে বলছেন, এস্টেট অফিসার দোকানে তালা দিয়ে অফিসে ডেকে আনেন এবং বানিজ্যিক ভাড়া ও অন্যান্য ফি জমা দেওয়ার একটি কাগজ ধরিয়ে দেন। সেই কাগজে যে পরিমাণ টাকা জমা দেয়ার কথা বলা থাকে তার চেয়ে দ্বিগুন অথবা তিনগুন টাকা তিনি আদায় করেন যার অধিকাংশ অর্থ তসরুফ করছেন এই কর্মকর্তা।
আলমগীর হোসেন নামের বড়খাতা স্টেশন এলাকার আরেক দোকান ব্যবসায়ী বলেন, “কয়েকদিন আগে আমার দোকানে গিয়ে বলেছিল আট বছরের একটা লাইসেন্স করতে ভ্যাটসহ বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি অফিসের ফিল্ড কানুনগো সিদ্দিকুর রহমানকে টাকা দেই। কিন্তু বার বার বললেও কোনো রশিদ তিনি দেননি।”
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০ এর অনুচ্ছেদ ১৩, ২২, ২৩ এবং ২৪ অনুযায়ী অবৈধ দখলকার উচ্ছেদ, লীজযোগ্য ভূমির তালিকা তৈরি এবং আবশ্যিকভাবে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নপূর্বক কেবল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেই রেলভূমির বাণিজিক লাইসেন্স প্রদানের বিধান রয়েছে। এ নীতিমালার অনুচ্ছেদ ১৫(খ) অনুযায়ী যে উদ্দেশ্যে রেলভূমি লীজ নেয়া হয়েছে সে উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে রেলভূমি ব্যবহার করলে লাইসেন্স বাতিলসহ উচ্ছেদ এবং প্রতি বর্গফুট ভূমির জন্য তিনগুণ জরিমানা আদায়সহ প্রয়োজনে সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে। অপরদিকে একই অনুচ্ছেদে সাংঘর্ষিকভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ২০২০ সালের পূর্বে কোন গৃহীত কৃষি, মৎস্য এবং নার্সারীর জন্য লাইসেন্স নিয়ে অন্য কোন উদ্দেশ্যে রেলভূমি ব্যবহার করলে তা বাণিজ্যিক হিসেবে গণ্য করে বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া আদায় করতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সাংঘর্ষিক বিধিকে ঢাল বানিয়ে যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষদের হয়রানি করা সহ বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লুটে নিচ্ছেন এই কর্মকর্তা। আবার আদায়কৃত অর্থ লীজ গ্রহীতাকে নিজে ব্যাংকে জমা দিতে না দিয়ে তিনি তার অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে সমুদয় অর্থ হতে নামমাত্র কিছু অর্থ এ-চালানের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা করান। তারপর তিনি কৃষি ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক কাজে রেলভূমি ব্যবহার করায় মাত্র তিন বছরের রাজস্ব জমা দেয়া জন্য অবৈধ দখলকার বা দোকান মালিকদের নামে একটি পত্র (ডিমান্ড নোটিশ) গোপনে এবং নথি অনুসরণ না করে স্বাক্ষর করেন এবং অবৈধ দখলকারী ব্যক্তির নাম পরিচয় এবং ভূমির তফসিল রেলওয়ের এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে নিজেই এন্ট্রি দিয়ে সেটার একটি কপি প্রিন্ট করে তাদেরকে ধরিয়ে দেন। কিন্তু তিনি যে পত্র স্বাক্ষর করেন সেটির কোন কপি, ব্যাংকের এ-চালানের কপি এবং ভূ-সম্পত্তি অফিস হতে রাজস্ব আদায়ের জ/১ রশিদের কপি তাদেরকে দেন না। এতে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, অনেক অবৈধ দোকানপাটের ২০২০ সালের পূর্বের কোন প্রকার কৃষি, মৎস্য বা নার্সারীর লাইসেন্স নেই। এ সকল অবৈধ দোকানপাট বহু বছর পূর্বে নির্মাণ করা হলেও মাত্র এক থেকে তিন বছরের রাজস্ব জমা করা হচ্ছে। অবৈধ দোকানপাটগুলো কোনো মাস্টারপ্ল্যানের ভূমিতে অবস্থিত নয়। এ সকল ভূমি নীতিমালা অনুযায়ী আদৌ লীজযোগ্য কিনা সে বিষয়ে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের কোন মতামত নেয়া হচ্ছে না, ফিল্ড কানুনগোর কোনো তদন্ত প্রতিবেদন নেই। অবৈধ দোকানপাট কতদিন যাবৎ রয়েছে সেটি সঠিকভাবে নির্ধারণ করে সরকারের রাজস্ব ধার্য করার জন্য স্থানীয় কোন প্রকার তদন্ত করা হচ্ছে না এবং তিনি যে পত্র স্বাক্ষর করেন সেটির সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিধি মোতাবেক অনুমোদন নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের দাবি, তিনি তার কর্মকালের স্বেচ্ছাচারিতা, অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, সরকারি রাজস্বের ক্ষতি এবং অনৈতিক কর্মকান্ড গোপন রাখার জন্য ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার এবং চীফ এস্টেট অফিসারকেও কিছু জানান না। এতে একদিকে যেমন রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করা হচ্ছে অন্যদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে তথা সরকার ব্যাপক পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, অবৈধভাবে রেলের জমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে এবং ভূ-সম্পত্তি অফিস হতে লীজ এনে দেয়ার নামে দালাল শ্রেণি গড়ে উঠছে।
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ মনজুর হোসেন এর এ সকল অনৈতিক কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের ভূ-সম্পত্তি অফিসের অফিস সহকারী জাবের হোসেন ও ফিল্ড কানুনগো সিদ্দিকুর রহমান। যদিও তারা এসব অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, মনজুর হোসেন তার কর্মকালে এ ধরণের শ্রেণি পরিবর্তন করার কতগুলো ভুয়া পত্র ইস্যু করেছেন এবং কার কার কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছেন, সরকারের কি পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়ে থাকতে পারে, তার দপ্তরের কে কে এ কাজে সহযোগিতা করেছেন তার হিসাব রেলওয়ের এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের তথ্য যাচাই বাছাই করে বের করা সম্ভব।
অফিসে নগদ টাকা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করলেও নিজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন অভিযুক্ত ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার মোঃ মনজুর হোসেন।
এরকম অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সদ্য যোগদানকৃত লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোঃ তসলিম আহমেদ খান।
অন্যদিকে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিফ স্টেট অফিসার মোঃ নাদিম সরোয়ার বলেন, খাজনা বা লাইসেন্স ফি আদায়ের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক লাইসেন্স যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দিতে হবে। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।