ট্রাম্পের ঐতিহাসিক চীন সফরে ‘ডিজিটাল লকডাউনে’ ছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা
সংবাদের আলো ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদ্য সমাপ্ত ৩ দিনের ঐতিহাসিক চীন সফরে তার সঙ্গে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সহকারীরা নজিরবিহীন ‘ডিজিটাল লকডাউনে’ ছিলেন। বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখার পর থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রায় সবাইকে তাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা আইপ্যাড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। মূলত চীনের ব্যাপক সাইবার নজরদারি ও হ্যাকিংয়ের আগ্রাসী পরিবেশ থেকে স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় তথ্য সুরক্ষার্থেই হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা দল এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৩ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করেন। এটি তার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চীন সফর। ২০১৫-২৬ সালের তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধাবস্থার পর গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সাময়িক ‘শুল্ক যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির পর এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই বেইজিং সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে অ্যাপল, বোয়িং, এনভিডিয়া, কোয়ালকম ও ব্ল্যাকরকের মতো শীর্ষ মার্কিন করপোরেট জায়ান্টদের প্রধান নির্বাহীরা (সিইও) অংশ নেন। বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি ও ইরান ইস্যুতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা চাওয়ার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গোপনীয় আলোচনা এই সফরের মূল লক্ষ্য হওয়ায় সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।
মার্কিন সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির দীর্ঘদিনের ধারণা— চীনে যেকোনো ব্যক্তিগত ডিভাইস বা হোটেলের ওয়াই-ফাই সংযোগ ব্যবহার করা মাত্রই তা হ্যাক হতে পারে। এই কারণে ট্রাম্পের শত শত সহযোগী, নিরাপত্তা কর্মী এবং কর্মকর্তাদের সাধারণ ফোন ওয়াশিংটনেই রেখে আসতে বাধ্য করা হয়। এর পরিবর্তে তাদের সরবরাহ করা হয় সম্পূর্ণ খালি বা ‘ক্লিন ডিভাইস’ এবং সাময়িক মেয়াদের ল্যাপটপ।
নিরাপত্তার এই কড়াকড়ির কারণে বেইজিংয়ে অফিশিয়াল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একপ্রকার অ্যানালগ পরিবেশ তৈরি হয়। কর্মকর্তারা সাধারণ কোনো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেননি। তাদের ক্লাউড অ্যাক্সেসও ছিল সীমিত। কোনো তাৎক্ষণিক বার্তার জন্য ডিভাইস ব্যবহারের পরিবর্তে সশরীরে কাগজের নথি আদান-প্রদান এবং মৌখিক বার্তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এছাড়া ‘জুস জ্যাকিং’ বা চার্জিং পোর্টের মাধ্যমে ডেটা চুরি এড়াতে বেইজিংয়ের কোনো স্থানীয় ইউএসবি বা চার্জিং প্লাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল; কর্মকর্তারা শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত নিজস্ব পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার করেছেন।
গোপন ও স্পর্শকাতর আলোচনার জন্য বেইজিংয়ের ফোর সিজনস হোটেলসহ নির্ধারিত এলাকাগুলোতে মার্কিন হোয়াইট হাউস মিলিটারি অফিস ও যোগাযোগ দল বিশেষ ‘এসসিআইএফ’ বা ইলেকট্রনিক আড়িপাতা-মুক্ত সুরক্ষিত জোন তৈরি করে।
সফর শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন কর্তৃক আমেরিকার সয়াবিন ও ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার মৌখিক প্রতিশ্রুতির কথা প্রচার করলেও, বেইজিং এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তির বিষয়ে নিশ্চিত করেনি। অন্যদিকে, বেইজিং থেকে তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চীন সাফ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কখনও শুরুই হওয়া উচিত ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ডিজিটাল লকডাউন’ ও সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগকে বরাবরের মতোই উড়িয়ে দিয়েছে চীন সরকার। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেঙ্গু জানান, বেইজিং আইনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। রাষ্ট্র কখনও নিয়মবহির্ভূত তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেয় না। তবে মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ভোল্ট টাইফুন’ ও ‘সল্ট টাইফুনের’ মতো চীনা হ্যাকিং চক্রের মার্কিন পরিকাঠামোতে অনুপ্রবেশ এবং ২০২৩ সালের নজরদারি বেলুন কাণ্ডের পর বেইজিংয়ের মাটিতে এমন সর্বোচ্চ স্তরের ডিজিটাল সতর্কতা বজায় রাখা ছাড়া মার্কিন প্রশাসনের আর কোনো উপায় ছিল না।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।