বেলকুচিতে শুল্কমুক্ত ‘বন্ডেড সুতা’ জব্দের পর রহস্যজনক ভাবে রাতে ছেড়ে দিল পুলিশ
জহুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার: সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে শুল্কমুক্ত ‘বন্ডেড সুতা’ জব্দ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রহস্যজনক ভাবে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। প্রথমে এটি শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত ‘বন্ডেড সূতা’ হিসেবে জব্দ করা হলেও পরে সেটিকে ‘গার্মেন্টসের বৈধ পলেস্টার ঝুট’ হিসেবে দেখিয়ে ১৪ ঘন্টা পর রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ–বেলকুচি–এনায়েতপুর সড়কের সীমান্তবর্তী সয়দাবাদ এলাকা থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে আসা সুতাভর্তি কাভার্ডভ্যানটি আটক করে বেলকুচি থানা পুলিশ। রাতে কোনো প্রকার মামলা ছাড়াই শুধুমাত্র একটি মুচলেকার মাধ্যমে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

মুচলেকাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে বেলকুচি থানা পুলিশ কিংবা উপজেলা প্রশাসন দায়ী থাকবে না। এতে বেলকুচি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুল আলম মুচলেকা নিয়েছেন। এর কপি এ প্রতিবেদকের কাছেও সংরক্ষিত রয়েছে।

বেলকুচি থানায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জহুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “স্থানীয় লোকজন ও গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে কাভার্ডভ্যানটি জব্দ করা হয়। পরে জানা যায়, মালামালটি গাছাবাড়ি গ্রামের সুতা ব্যবসায়ী হাজী ইসমাইল হোসেনের কেনা। তার প্রতিনিধি আলমগীর হোসেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা শেষে তার নির্দেশে মালামালসহ গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, মুচললেকায় এসআই শামসুল আলম স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছেন। এই প্রতিবেদক “কাভার্ডভ্যান জব্দের পর বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুপুরে তথ্য জানতে থানায় গেলে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা মিটিংয়ে আছেন বলে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ বেলকুচিতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা কৌশলে শুল্কমুক্ত বন্ডেড সূতা প্রায়ই পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে বেলকুচির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, “জব্দকৃত কাভার্ড ভ্যানে লুঙ্গি তৈরির সূতা ছিল বলে পুলিশ জানায়। শুল্কবিহীন আমদানিকৃত চায়না-ভারতের বন্ডেড সুতা ছিল না। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ মালিকদের হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব সংক্রান্তে বৈধ কাগজপত্রের কপি হয়তো বেলকুচি পুলিশের কাছে সংরক্ষণ আছে।

অন্যদিকে, গাছাবাড়ির সুতা ব্যবসায়ী হাজী ইসমাইল হোসেন ও তার প্রতিনিধি আলমগীর হোসেন শুক্রবার বিকেলে দাবি করেন, “ঢাকা থেকে নগদ টাকায় গার্মেন্টসের বৈধ ঝুট সুতা কিনে আনার সময় সাংবাদিকদের সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণে গাড়িটি আটক করে বেলকুচি থানা পুলিশ। সাংবাদিকগন চোরাচালানের বন্ডেড সুতা মনে করে বেলকুচি থানা পুলিশকে খবর দেন। পরবর্তীতে কাগজপত্র যাচাই শেষে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন মুশলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত: দেশের প্রান্তিক তাঁতিদের সহায়তার লক্ষ্যে সরকার ভারত ও চীন থেকে শুল্কমুক্ত বন্ডেড সূতা আমদানির সুযোগ দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এসব সূতা কম দামে প্রান্তিক তাঁতিদের কাছে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব বন্ডেড সূতা গোপনে পাচার ও কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে তাঁত সমৃদ্ধ বেলকুচির অত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক তাঁতিদের জন্য বরাদ্দ বন্ডেড সূতা চোরাচালানের মাধ্যমে প্রভাবশালী সুতা ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। সর্বশেষ এই কাভার্ডভ্যান জব্দ ও ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি সেই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।