বিরোধী দল সেই সংস্কারের কথা বলে, যেই সংস্কার উনাদের ক্ষমতার ভাগ দেবে
সংবাদের আলো ডেস্ক: ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট সমালোচনা নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বিরোধী দল সেই সংস্কারের কথা বলে, যেই সংস্কার উনাদের ক্ষমতার ভাগ দেবে। তিনি বলেন, বিরোধী দল মাঝে মধ্যেই সংস্কারের কথা বলেন, জুলাই সনদের কথা বলেন, উনারা শুধু সেই সংস্কারের কথা বলেন, যেই সংস্কার উনাদের ক্ষমতার ভাগ দেবে। উনারা স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার নিয়ে একদিনও আজ পর্যন্ত কথা বলেননি।
রোববার (২৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন প্রেক্ষাপটে এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে, তা আমরা সবাই জানি। বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসনে আমাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একটি গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ নির্বাচিত হয়েছে। তাই, এই সংসদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক এবং সরকারের দায়িত্ব সেই প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির সমন্বয় করা, আমাদের সীমিত সম্পদের ভেতর দিয়ে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, স্বাস্থ্যখাতে আমাদের বাজেট নিয়ে আমার আলোচনাকে ফোকাস করতে চাই। আমাদের স্বাস্থ্যখাতের যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, আমার বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের বলব, আপনারা তর্ক করার জন্য নয়, কিংবা সমালোচনার জন্য নয়, আসুন আলোচনার জন্য। আমরা কথা বলি এবং বোঝার চেষ্টা করি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমাদের এই স্বাস্থ্য বাজেট যে লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে সে লক্ষ্যটি হচ্ছে— আমরা এই ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চাই, একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করতে চাই। যেখানে ধনী-গরীব নির্বিশেষে বিনামূল্যে সহজলভ্য চিকিৎসা পাবেন। অর্থাৎ একটি এক্সেসেবল এফোরডেবল এবং ইনক্লুসিভ হেলথ সিস্টেম করার জন্য এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিগত বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে এবার ৬৯ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করেছে আমাদের সরকার। এই বিশাল বিনিয়োগের প্রধান কারণটা কী? স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ শুধুমাত্র হাসপাতাল তৈরি নয়, কিংবা জনগণের স্বাস্থ্যের সাময়িক উন্নতি নয়। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ পুরো জনগোষ্ঠী গড় আয়ু বৃদ্ধি করে। মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচতে দেয়। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ দারিদ্র নিরসন করে, মানুষকে সুস্থ এবং প্রোডাক্টিভ রাখে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বাজেট আলোচনায় জানান, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ আমাদের ওয়েলবিং এবং হ্যাপিনেস তৈরি করে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ আমাদের সমাজে বৈষম্য দূর করে, সম্প্রীতির সমাজ তৈরি করে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে যে বড় চ্যালেঞ্জগুলো আমরা এই সময় দেখতে পাচ্ছি, সর্বাত্মকভাবে মানুষের যে মৃত্যু হয়, তার শতকরা ৭১ ভাগ বাংলাদেশে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা অসংক্রামক ব্যাধির কারণে হচ্ছে। অর্থাৎ ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, কিডনির রোগ এই সমস্ত কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এবং বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় স্বাস্থ্যখাতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অতিমারি এবং মহামারির সংখ্যা একইসঙ্গে নগরায়ণ, দ্রুতগতিতে মানুষ গ্রাম থেকে নগরে চলে আসছে এবং সেখানে একটি দরিদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের জীবন যাপন করতে হচ্ছে। প্রযুক্তি উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে ও প্রযুক্তির ব্যবহারের যে সুযোগ আছে, সেই সুযোগগুলোকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাত এবং চিকিৎসাকে আরও বেশি কার্যকর করে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে দেশে প্রধান একটি সমস্যা চিকিৎসার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, এই খরচের শতকরা ৭৯ ভাগ আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার। অর্থাৎ রোগীর পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়। এই একই সংখ্যাটি থাইল্যান্ডে মাত্র শতকরা ১০ ভাগ এবং মালদ্বীপে মাত্র ১৮ ভাগ, আমাদের দেশের মানুষকে ৮০ ভাগ পকেট থেকে টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। তাই এই বাজেটকে দেখতে হবে এমন একটি বাজেট, যে বাজেটে অপরিকল্পিতভাবে এখানে-সেখানে বিল্ডিং আর হাসপাতাল তৈরি করার কোনও পরিকল্পনা নেই।
বাজেট নিয়ে বিরোধীদলের সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই বাজেট আমাদের বিরোধী দল মাঝে মধ্যেই সংস্কারের কথা বলেন, জুলাই সনদের কথা বলেন। উনারা শুধু সেই সংস্কারের কথা বলেন, যেই সংস্কার উনাদেরকে ক্ষমতার ভাগ দেবে। উনারা স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার নিয়ে একদিনও আজ পর্যন্ত কথা বলেননি। একটি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন হয়েছিল। তারা অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে অনেক কিছু লিখে দিয়েছেন। আমি খুশি হতাম আমাদের বিরোধী দল যদি, সেই স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আমাদের এখানে কথা বলতেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে, সংস্কার করতে। স্বাস্থ্যখাতে ভৌত কাঠামোর সংস্কার দরকার, প্রতিটা বিল্ডিং ভেঙে পড়েছে, মানব সম্পদের সংস্কার প্রয়োজন, চিকিৎসা পদ্ধতিসহ হেলথ ম্যানেজমেন্টের ইমপ্রুভমেন্ট দরকার, ডিসেন্ট্রালাইজেশন দরকার এবং কেনাকাটার ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি এবং একাউন্টেবিলিটি দরকার। আমরা এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে নগর এবং গ্রামের মানুষ একই ধরনের স্বাস্থ্য পাবে। আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবো- যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হবে আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এবারের বাজেট যেমন শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, পাশাপাশি আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে। আমরা জোর দেব রোগ প্রতিরোধে, রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই আমরা সেটাকে থামানোর চেষ্টা করব।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।