বিএনপির অনেক কাজই জুলাই স্পিরিটের সঙ্গে মেলে না
সংবাদের আলো ডেস্ক: জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের তীব্র সমালোচনা করে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরই শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। দেশের বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়লেও বাস্তবায়নের হার হাঁটছে উল্টোপথে।
তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক মূল্যায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছিল ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা ১৯৭৬-৭৭ সালের পর সর্বনিম্ন। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেও এই হার মাত্র ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে। এই ধারাবাহিক ঘাটতি আমাদের সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। অবাস্তব ও অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, জিডিপির দীর্ঘদিনের নিম্ন অবস্থান, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের চাপ, নীতি প্রণয়নের অতিকেন্দ্রীকরণ এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দুর্বল আর্থিক কাঠামো, ব্যাংক খাতের মূলধন সংকট এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাবে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রোববার (২১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ১১তম দিনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দের বড় অসংগতি ও গরমিল তুলে ধরে মাসুদ সাঈদী বলেন, শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও মন্ত্রণালয়ের তিন বিভাগের বিস্তারিত হিসাবে বড় অঙ্কের গরমিল রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের ৪৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা মেলালে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। তিনি সংসদে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে বাকি ১৪ হাজার কোটি টাকার হিসাব কোথায় এবং এই টাকা কোথায় খরচ করা হবে তা বাজেটে কেন স্পষ্ট করা হয়নি।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, অর্থমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে বিএনপির অনেক কাজই সেই জুলাই স্পিরিটের সঙ্গে মেলে না। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি দখল, অফিস দখল এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে। জুলাই স্পিরিটের বিরুদ্ধে গিয়ে ইতিমধ্যে ৫৬টি উপজেলায় জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নির্বাচনে পরাজিত কিছু ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া দেশের আটটি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চুক্তিভিত্তিক পদে বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড রাষ্ট্র সংস্কার ও মেরামতের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির স্লোগান ছিল ‘সবার আগে দেশ’, কিন্তু জনগণের কাছে এখন মনে হচ্ছে তাদের আসল নীতি হলো ‘সবার আগে বিএনপি এবং সবার আগে ক্ষমতা’। সংসদে বিরোধী দলীয় ও অন্যান্য দলের সংসদ সদস্যদের বাজেট বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত করে কেবল সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন।
দেশের ব্যবসায়িক ও স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মাসুদ সাঈদী বলেন, বিনিয়োগে শুল্ক ছাড় কিংবা প্রণোদনার ওয়াদা দিলেও আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত না হলে বিনিয়োগ আসবে না। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক আচরণ এবং একটি হাসপাতালের লাইসেন্স তড়িঘড়ি করে বাতিল করার ঘটনা প্রমাণ করে সরকার ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায় না। সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা মাথা ব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার শামিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি ভাইরাল বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে হাত জোড় করে বলেছিলেন যেন কোনোমতে নির্বাচনটা পার করে দেওয়া হয় এবং নির্বাচনের পর তার আসল জঘন্য রূপ দেখার কথা বলেছিলেন। তড়িঘড়ি করে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার সেই প্রতিশ্রুত রূপই দেখালেন কিনা তা নিয়ে জনগণের মনে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নিজের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন ও স্থানীয় দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন মাসুদ সাঈদী। তিনি পিরোজপুরকে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা এবং জেলায় রেললাইন সম্প্রসারণের দাবি জাতীয় সংসদে পূরণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পিরোজপুরে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি বড় দুর্নীতি হয়েছে, যা সংসদের সবাই অবগত। এই দুর্নীতির কারণে বিগত দুই বছর ধরে এলাকায় কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি এবং নাজিরপুরসহ পিরোজপুরের প্রত্যেকটি এলাকার রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি এই বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট দ্রুত সংস্কারের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।