হাম ও উপসর্গে সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি মৃত্যু
সংবাদের আলো ডেস্ক: নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্যের সঙ্গে মিলছে না। কেন্দ্র থেকে দেওয়া মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুটি বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্যে সরকারি হিসাবের চেয়ে ৩৫ জন বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহাখালীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে নিশ্চিত হামে মারা গেছে দুজন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগের হাম ইউনিটে এ পর্যন্ত ২৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বাকি ২৬ জন মারা গেছে হাম সন্দেহে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় হিসাবে ২৪ জনের গরমিল পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ২৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি সমকালকে নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান। তিনি আরও বলেন, হামের উপসর্গে বিভাগের সবগুলো মৃত্যুর ঘটনা এই হাসপাতালে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহাখালীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ১২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং পাঁচজন হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অথচ বিভাগীয় তথ্য বলছে, বরিশালে ২৫ জন উপসর্গ নিয়ে এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে তিনজন। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় তথ্যে ১১ জনের হিসাবে গরমিল পাওয়া গেছে।
বরিশাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ জন, ভোলায় ছয়জন, বরগুনায় দুজন ও ঝালকাঠিতে দুজন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এ ছাড়া, বরগুনায় হাম আক্রান্ত হয়ে তিনজন মারা গেছে বলে বিভাগীয় তথ্যে জানা গেছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মার্চে মোট আটজন, এপ্রিলে ১৪ জন ও মে মাসে বিভাগে ছয়জন মারা গেছে।
সারাদেশের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ করে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগ।
এই বিভাগের পরিচালক আবু আহাম্মদ আল মামুন বলেন, ‘তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সংখ্যায় কিছু অমিল থাকতে পারে। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন বিভাগভিত্তিক হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করছে।’
আরও ১২ শিশুর মৃত্যু, ৫৩ দিনে প্রাণহানি ৩৩৬
২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছিল এবং বাকি ১১ জন মারা গেছে উপসর্গ নিয়ে। এ নিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩৩৬ শিশুর মৃত্যু হলো।
গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময়ে সারাদেশে আরও এক হাজার ২৩৮ শিশু শরীরে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৭ শিশু। তাদের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৮৬ জনের।
গতকাল বৃহস্পতিবার হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ঢাকার ছয়জন। একজনের নিশ্চিত হাম ছিল। অন্য পাঁচজন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এ ছাড়া রাজশাহীতে দুজন, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেটে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ২৭৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৫৭ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৫ হাজার ৪৯৮ শিশুর। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩১ হাজার ৯১২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ২৮ হাজার ২৩৮ শিশু বাড়ি ফিরেছে। এ সময়ে দেশে ছয় হাজার ২০৭ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত মাসে প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকা দেওয়া হয়েছিল। এক মাস পর দেখা গেছে, এসব উপজেলায় হামের সংক্রমণ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। গত বুধবার ‘হাম-রুবেলা টিকা কার্যক্রম ২০২৬ পর্যালোচনা এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
বৈঠকের উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশজুড়ে চলমান হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইনের সফলতার হার ৯৩ শতাংশ। তবে সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদানে অন্তত ৯৫ শতাংশ কাভারেজ নিশ্চিত করা জরুরি। বৈঠকে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণের বিপদটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। যারা মাঠে কাজ করেছেন, তারাই এর ভয়াবহতা টের পেয়েছেন।
আক্রান্তের ৬৫ শতাংশ টিকা পায়নি
আলোচনায় মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ। উপস্থাপনায় বলা হয়, শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়। তিন ধাপে পরিচালিত এই কর্মসূচি প্রথমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পৌরসভা ও উপজেলা, পরে বড় সিটি করপোরেশন এবং শেষে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে ক্যাম্পেইনের সাফল্যের হার ৯৩ শতাংশ, যা ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম ধাপে টিকা পাওয়া ৩০ উপজেলায় সংক্রমণ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
ময়মনসিংহে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৭
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৭ মার্চ থেকে হাসপাতালটিতে হামের লক্ষণ নিয়ে আসা মোট ২৭ শিশুর প্রাণহানি ঘটল।
গোপালগঞ্জে হাম সন্দেহে নারীর মৃত্যু
জেলায় হাম উপসর্গে নূরজাহান (৩৫) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে তাঁর মৃত্যু হয়। নূরজাহান শহরের নবীনবাগ এলাকার শাহাবুদ্দিন সিকদারের মেয়ে।
সূত্র: সমকাল



সংবাদের আলো বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।