
সংবাদের আলো ডেস্ক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন।
আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতাদের কাছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার বার্তা দিয়েছেন। একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি প্রাপ্তি।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারকেই এ সংকটের সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্ব নেতারা বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেছেন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। চার দিনের সফরে ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন মাহদী আমিন। গত সাত মাসে সরকার মানবাধিকার রক্ষা করে কীভাবে কাজ করেছে, বৈঠকে সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গেও একটি বৈঠক হয়েছে। এর ফলে সামনে বাংলাদেশ বিমানের বহর আরও বড় করার সুযোগ তৈরি হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি প্রেস ব্রিফিংয়ের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮০টির বেশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি বহর নিয়ে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন।
মাহদী আমিন বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন ৩৫ জন। এতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ পদমর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছিলেন। এর বাইরে শুধু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা সফরে ছিলেন।
তিনি বলেন, চার দিনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রায় ৫০টি পৃথক বৈঠকে অংশ নেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮০টির বেশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ততার কারণে প্রতিনিধিদলের বড় অংশ নিয়ে দেশে ফিরলেও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের একটি দল ক্যালিফোর্নিয়ায় গেছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, সেখানে প্রযুক্তি, শিল্প ও একাডেমিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কার্যক্রম চলছে।
জাতিসংঘের মূল কর্মসূচিতে ৮ অনুষ্ঠান
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের ৩০টি কর্মসূচির মধ্যে আটটি সরাসরি জাতিসংঘ সদরদপ্তরের মূল কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে অংশগ্রহণ এবং সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ।
তিনি বলেন, ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নবনির্বাচিত সরকারের নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত প্রাতরাশ সংবর্ধনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনায়ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন বলে জানান মাহদী আমিন। এসব অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমানের কুশলবিনিময়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জলবায়ু ও পরিবেশে বাংলাদেশের পরিকল্পনা
মাহদী আমিন বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি ও বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর করা এবং জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের কথাও জানান মাহদী আমিন।
স্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে আরও দুটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানান তিনি। এর একটি ছিল স্বাস্থ্যসেবা ও মিডওয়াইফারি নিয়ে। সেখানে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো, স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং দ্রুত ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বাড়ানোর পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং নাগরিকদের ই-হেলথ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনাও জাতিসংঘে তুলে ধরা হয়েছে।
‘৩ আর’ নীতির কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘের ভাষণে দীর্ঘ সময় পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী—এমন দাবি করে মাহদী আমিন বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, নারী, যুব ও শিশুদের কল্যাণ এবং অর্থনীতি ও রাজনীতি পুনর্গঠনে ‘৩ আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশনের দর্শন তুলে ধরেছেন তিনি।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড ও ইউনিভার্সাল কার্ডের পরিকল্পনার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও স্টার্টআপ তহবিলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, জলবায়ু সুরক্ষার পাশাপাশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথাও প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউটের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
১১ দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক
মাহদী আমিন জানান, চার দিনে ১১টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। দেশগুলো হলো পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতি।
এসব বৈঠকে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন, জনশক্তি রফতানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নির্বাচনে বিজয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং শান্তিরক্ষা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবদানের প্রশংসা করেছেন বলেও দাবি করেন মাহদী আমিন।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট, গেটস ফাউন্ডেশন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। ওয়াল স্ট্রিটের প্রায় ২৫ জন শীর্ষ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার ও নতুন আর্থিক উপকরণ চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বোয়িং গ্লোবালের সঙ্গে বৈঠকে বিমানের বহর সম্প্রসারণে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন মাহদী আমিন।
বিভিন্ন কর্মসূচিতে ডা. জুবাইদা রহমান
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে আটটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং তিনটিতে বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন ডা. জুবাইদা রহমান। ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি তুলে ধরার পাশাপাশি মিডওয়াইফারি-সংক্রান্ত একটি সাইড ইভেন্টেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সমতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের হাত ধরে শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বড় ভূমিকা পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.