
সংবাদের আলো ডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৩৬০ জনেরও বেশি মানুষ। উদ্ধারকর্মীরা কংক্রিটের স্তূপের নিচে এখনও জীবিতদের সন্ধানে অবিরাম তল্লাশি চালাচ্ছেন। নিখোঁজ স্বজনদের সংবাদের জন্য ধসে পড়া ভবনগুলোর সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ।
গত বুধবা (২৪ জুন) মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে উত্তর ভেনেজুয়েলায় পর পর দুটি শক্তিশালী ভূকম্পন আঘাত হানে। এর মধ্যে দ্বিতীয় কম্পনটি ছিল গত এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটির ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী, যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ডজন ডজন ভবন ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা এই জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই রাজ্যেই দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দরের একটি এবং প্রধান বিমানবন্দর ‘সিমন বলিভার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ অবস্থিত।
লা গুয়াইরাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ৩টি শিশুর জীবিত উদ্ধার হওয়ার ঘটনা পুরো দেশের মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জুগিয়েছে। একটি ধসে পড়া ভবনের কংক্রিটের ফাটল থেকে ধুলোবালিতে মাখামাখি অবস্থায় একে একে ৩ ভাইবোনকে জীবিত বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, প্রথম শিশুটি বের হওয়ার পর উদ্ধারকারী ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি ভাইবোন? তখন দ্বিতীয় শিশুটি (একটি মেয়ে) উত্তর দেয়, হ্যাঁ, আমরা তিনজন। এর কিছুক্ষণ পরই কিছুটা কষ্ট হলেও ধুলোয় ধূসরিত তৃতীয় বোনটিকেও অক্ষত অবস্থায় টেনে বের করা হয়। লা গুয়াইরার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, কেবল এই রাজ্যেই এ পর্যন্ত ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও অন্তত ১৭২ জন মানুষ বিভিন্ন ভবনের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত ২১৪ বারেরও বেশি আফটারশক বা অনুকম্পন অনুভূত হয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।শত শত বহুতল ভবন, হাসপাতাল ও শপিং মল ধসে গেছে। অন্তত ১ হাজারেরও বেশি অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ধসে পড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা এই বিপুল পরিমাণ আহত মানুষের চাপ সামলাতে পারছে না। ডাক্তার পেড্রো হাভিয়ের ফার্নান্দেজ বিবিসিকে বলেন, দশকের পর দশক ধরে সাধারণ দিনগুলোতেই আমাদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী থাকে না। এই মহাবিপর্যয়ে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য চরম কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই ক্রান্তিকালে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। যুক্তরাজ্য থেকে নিখোঁজদের সন্ধানে ড্রোন ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরসহ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি বিশেষ দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ড থেকেও উদ্ধারকারী দল এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ১৫০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সাহায্য এবং রসদ বহনের জন্য যুদ্ধজাহাজ ও কার্গো বিমান মোতায়েন করেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার এই সংকটে বৈশ্বিক সমন্বিত সহায়তার মাধ্যমে ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে।
এই ট্র্যাজেডির মাঝেও এক মর্মস্পর্শী গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাড়া দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার পেশাদার ফুটবলার হেক্টর বেলো ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের সময় তার স্ত্রী আন্দ্রেয়া নিজের জীবন দিয়ে তাদের ছোট কন্যাসন্তানকে বাঁচিয়ে গেছেন। ভবনের ছাদ ধসে পড়ার মুহূর্তে আন্দ্রেয়া নিজের শরীর দিয়ে সন্তানকে আড়াল করেন, ফলে শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তিনি নিজে মারা যান। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ১ জন পর্তুগিজ, ২ জন ব্রাজিলিয়ান ও ৪ জন স্প্যানিশ নাগরিকের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। স্পেনের গণমাধ্যম জানিয়েছে, এখনও তাদের ১০৬ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় এমন এক সময়ে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানল যখন দেশটিতে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছে। মাত্র ছয় মাস আগে দেশটির দীর্ঘকালীন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে মার্কিন বাহিনী গ্রেপ্তার করে মাদক পাচারের অভিযোগে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। এরপর মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেন, যা দেশটির বিরোধী দলগুলোর সমর্থকদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেই শতাব্দীর অন্যতম বড় এই দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল দক্ষিণ আমেরিকার এই তেলসমৃদ্ধ দেশটি।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.