
সংবাদের আলো ডেস্ক: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে বলবো— আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতবাদ প্রচার করবেন, কিন্তু সংঘাতে কখনো জড়াবেন না।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বড় মাঠে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচনের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী প্রচারণায় এসেছিলেন। তিনি আপনাদের সামনে কতগুলো কথা দিয়েছিলেন। আমরা যে দাবিগুলো রেখেছিলাম, তার মধ্যে ছিল আমাদের একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি হয়ে গেছে, ভাইস চ্যান্সেলর বসে আছেন, সামনে এখন শিক্ষক নেবে। জমির টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। কালকে ইনশাআল্লাহ আমরা সেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করব। সেখানে আপনাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া, উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারবে। এখানে মেডিকেল কলেজের কথা বলেছিলাম, আমাদের মনে আছে। আপনাদের মেডিকেল কলেজ হয়েছে, জায়গাও ঠিক হয়ে গেছে, আগামী বছর থেকে ইনশাআল্লাহ ছাত্রভর্তি শুরু হবে। আমাদের ভূল্লী ও রুহিয়ার দুইটা আলাদা উপজেলা করার দাবি ছিল আপনাদের, দুটোই হয়ে গেছে, ইউএনও যোগ দিয়েছেন এবং কাজ শুরু হয়ে গেছে।
বিমানবন্দর ও শিল্পায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিমানবন্দর আপনারা চাইছিলেন, আমি রাজি হয়েছি আপনাদের কথায়। বিমানবন্দর হলে আমাদের সাধারণ মানুষ খুব একটা উপকৃত হবে তা নয়, কিন্তু যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করবেন তাদের জন্য সহজ হবে। কিন্তু বিমানবন্দরটাকে যদি চালু করতে হয়, ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে আমাদের এখানে কলকারখানা বাড়াতে হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। আমাদের এখানে কলকারখানা, ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি একদম নেই। মানুষের কাজ নেই। এই কাজের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। সরকারে আসার পরপরই আমরা এখানে অর্থ উপদেষ্টাকে নিয়ে এসেছিলাম, তিনি পুরো জায়গাটা দেখেছেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীও এসেছিলেন, তিনিও সব ঘুরে দেখেছেন। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার জন্য কিছু বিনিয়োগকারীকে এখানে নিয়ে আসতে সক্ষম হব।
চীনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন, আমরা এখানে চীনের রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে এসেছিলাম। এই স্টেডিয়ামে তিনি প্রায় ছয় হাজার শিশুকে স্কুলব্যাগ দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে দশজন ছাত্র ও পাঁচজন শিক্ষককে চীনে ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা আশা করছি, এখানে কলকারখানা তৈরির জন্য চীন থেকেও বিশেষজ্ঞরা আসবেন।
রাজনৈতিক সহনশীলতার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমরা ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ খুব নির্ঝঞ্ঝাট। এখানে মামলা-মোকদ্দমা সবচেয়ে কম হয় এবং সবাই নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চায়। আমরা এই অবস্থাটা রাখতে চাই। আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। আমরা সব রাজনৈতিক দলকে বলব, আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতবাদ প্রচার করবেন, কিন্তু কখনো সংঘাতে জড়াবেন না। অতীতে আমরা দেখেছি, ঠাকুরগাঁওয়ে আমাদের গণতন্ত্রকামী মানুষদের ওপর কী অকথ্য নির্যাতন হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, শত শত-হাজার হাজার মিথ্যা মামলায় আমাদের শ্রমিক-কৃষকদের অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সেই সময়টা পার হয়ে এসেছি।
তিনি আরও বলেন, প্রিয় ঠাকুরগাঁওবাসী, আমি সেসব কথা বলে আপনাদের ভারাক্রান্ত করতে চাই না। আমরা অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে আজ এখানে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে দেখলেন, কয়েকজন মহিলা এসে সহযোগিতা নিয়ে গেলেন, তাদের সকলেরই সন্তান এই সংগ্রামে নিহত হয়েছে। এ রকম মৃত্যু, এই রক্তপাত আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, সেই গণতন্ত্রকে আমরা রক্ষা করতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই একটা সমঝোতার রাজনীতি দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই না যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হয়। আমরা দেখতে চাই সবাই একসঙ্গে একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার নিয়ে বসবাস করুক।
মঞ্চে উপস্থিত অন্য দুই রাজনৈতিক নেতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে আজ দুলু সাহেব আছেন, তার জেলা লালমনিরহাট, তিনি সেখানে চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরি করেছেন। আমাদের পাশের জেলার মন্ত্রী ফরহাদ আজাদ সাহেবও আছেন, তিনিও পঞ্চগড়কে একটি আলোকিত জেলা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। আমার অনুরোধ থাকবে, কোনো হানাহানি নয়, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা রাজনীতি করব। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সহিষ্ণুতা।
মন্ত্রী থাকাকালে নেওয়া উদ্যোগের কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি যখন মন্ত্রী ছিলাম, তখন এই এলাকায় মাদরাসা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭২ কোটি টাকার সহযোগিতা করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে একটি স্পোর্টস ভিলেজ তৈরি হবে, উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে, জেলায় আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়, সমবায় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং পীরগঞ্জে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি ইনশাআল্লাহ আমরা চালু করতে সক্ষম হবো। বরেন্দ্র মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সের মাধ্যমে আমরা এখানে কৃষির উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছি। গোবিন্দপুরের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক নতুন করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে।
প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই পত্রিকায় দেখেছেন, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার লোক নেওয়া হবে, তার মধ্যে ঠাকুরগাঁও থেকে লোকজন একেবারে বিনা খরচে যেতে পারবে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফ সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনি আমাদের ঠাকুরগাঁও থেকেই এটা শুরু করবেন। তবে আমার একটা অনুরোধ, নিজের পায়ে নিজে না দাঁড়ালে কেউ দাঁড়াতে পারে না। শুধু চাকরি আর ঠিকাদারির পেছনে দৌড়াবেন না, নিজেরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন।
তরুণ সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও, মাদককে বর্জন করো। লালমনিরহাটের মতো আমাদের ঠাকুরগাঁওকেও একটি মাদকমুক্ত এলাকা ঘোষণা করার জন্য কাজ শুরু করো। আমি জেলা প্রশাসককে বলেছি, অন্য সংসদ সদস্যদেরও বলব এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে। ব্যবসায়ীদের কাছে অনুরোধ, আপনারা একতাবদ্ধ হয়ে আরও বেশি বিনিয়োগ কীভাবে করা যায়, সেই চেষ্টা শুরু করুন। আমি যেখানেই থাকি, আপনাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা অবশ্যই করবো।
জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, কিছুক্ষণ আগে দুলু সাহেবের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তিনি বললেন প্রথমে দুঃখ পেয়েছিলেন, পরে খুশি হয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, আমাকে তো এমন জায়গায় পাঠিয়ে দিলেন, যেখানে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগটা আগের চেয়ে অনেক কমে গেল। তবে আপনাদের এটুকু কথা দিতে পারি, যখনই চাইবেন, জেলা প্রশাসকসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, চিঠি দিয়ে জানাবেন, ইনশাআল্লাহ আমি যথাসাধ্য আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা করবো। মনে করবেন না যে আমি আপনাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেছি। আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আপনাদের সঙ্গেই থাকবো।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বলেন, আমার জন্ম এখানে, আমার শৈশব কেটেছে এখানে, আমার স্কুলজীবন এখানে। আমার শিক্ষকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তারা আমাকে মানুষ করেছেন। আমি রুস্তম আলী স্যার ও খান ইউসুফ স্যারকে ভুলতে পারি না, তারা আমাকে গড়ে তুলেছেন, চলতে শিখিয়েছেন, সততা ও নেতৃত্ব শিখিয়েছেন। এই জিনিসগুলো আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আসুন এমন একটা সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে আমাদের সকলের মধ্যে ঐক্য থাকবে, ভালোবাসা থাকবে। ৫ আগস্টের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একটা ছোট্ট বিবৃতি দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, আমরা অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তপাতের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ পেয়েছি। আসুন, আমরা সংঘাত নয়, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এমন একটা সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে আমরা সবাই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবো।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না। আমি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমাকে আজ এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছেন, যেখানে আমি আপনাদের জন্য কাজ করতে পারবো। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে সেই তাওফিক দেন, যাতে জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য কাজ করে যেতে পারি।
পরিশেষে ঠাকুরগাঁওবাসীর শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে তিনি বলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’
নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আব্দুস সালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুর রহমান, রাষ্ট্রপতির বাল্যবন্ধু প্রফেসর মনতোষ কুমার দে, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন প্রধান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইএসডিও'র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ-জামান।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটাই মির্জা ফখরুলের প্রথম নিজ জেলা সফর। দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামে পৌঁছান তিনি। যেখানে তাকে স্বাগত জানান ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হকসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.