
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোনা পৌর শহরের উত্তর কাটলী এলাকায় নিজ বাসার খাটের নিচ থেকে মনোয়ারা বেগম চায়না (৪৮) নামে এক গৃহবধূর গলাকাটা হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তার স্বামী আবু চান (৬০) ও ছেলে মুন্না (২৫)। আবুচান নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং মুন্নার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘাতক আব্দুর রশীদ (৩৪) নামে এক প্রতিবেশী রিকশাচালককে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন।
সোমবার (১ জুন) রাতে এশার নামাজের সময় পৌরসভার কাটলী এলাকার সাব-ঠিকাদার আবু চানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী রিকশাচালক আব্দুর রশীদের সাথে মনোয়ারা বেগমের দীর্ঘ দিনের পারিবারিক সম্পর্ক। প্রায়ই মনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন এবং তাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করতেন। সোমবার দিনের বেলায় মনোয়ারা বেগমের বাসায় পানির সংকট থাকায় পানি এনে দেন নিজের বাসা থেকে। সন্ধ্যার পরও তিনি ওই বাসায় যান। এরপর কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আবু চান তার বড় ছেলে আনোয়ারকে ফোন করে বাসায় হামলার কথা জানান। খবর পেয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে এসে আবু চান ও তার ছেলে মুন্নাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে মুন্নার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এইদিকে ঘাতক আব্দুর রশিদকে রক্তাক্ত অবস্থায় আটক করে রশি দিয়ে বেধেঁ রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর পর পরিবারের সদস্যরা মনোয়ারা বেগমকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে ঘরের খাটের নিচে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে হত্যার পর মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
নিহতের ছোট মেয়ে ইশা মনি বলেন, আব্দুর রশীদ প্রায়ই আমার মায়ের কাছে টাকা ধার নিত। তিনি মাকে ‘আপা’ বলে ডাকতেন। মা তাকে গরিব মানুষ মনে করে সাহায্য করতেন। আজও সম্ভবত টাকা নেওয়ার জন্য আমাদের বাসায় এসেছিলেন। সকালে আমাদের বাসায় বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যা ছিল। তখন তিনি নিজে থেকেই পানি এনে দেওয়ার কথা বলেন এবং কয়েকবার পানি এনে দেন। তবে আজ তার আচরণে আমি অস্বস্তি বোধ করি। তিনি আমার সঙ্গে এমন কিছু আচরণ করেন, যা আমার কাছে ভালো লাগেনি। বিষয়টি আমি মাকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু মা বলেছিলেন, তিনি তো পরিচিত মানুষ, হয়তো আমার ভুল ধারণা হতে পারে। পরে আমি প্রাইভেট পড়তে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। বের হওয়ার সময় মা আমাকে সাবধানে যেতে বলেন। সবকিছু তখন স্বাভাবিকই ছিল। কিছুক্ষণ পর বাসায় ফিরে দেখি চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি। তখন জানতে পারি, আমার ভাইকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। আমার বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় ছিলেন। তিনি আমাকে বলেন, আমার ভাইকে কুপিয়েছে। তখনও আমরা কেউ জানতাম না, আমার মায়ের কী হয়েছে। সবাই ধারণা করছিলেন, মা হয়তো বাসার বাইরে কোথাও গেছেন। বাবা ও ভাই কেউই জানতেন না যে মায়ের মরদেহ ঘরের খাটের নিচে পড়ে আছে। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে খাটের নিচে আমার মায়ের মরদেহ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “একজন ব্যক্তির পক্ষে একা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মরদেহ লুকিয়ে রাখা কঠিন। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে।”
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকার এবং নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন সরকার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকার বলেন, “এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। ফরেনসিক টিম ও পিবিআইকে ঘটনাস্থলে কাজ করার জন্য অবহিত করা হয়েছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.