
সংবাদের আলো ডেস্ক: পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির জিম্মি দশার কবলে পড়া আবারও ২৪ জেলেকে স্বদেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে বিজিবির সদস্যরা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরের দিকে টেকনাফ পৌরসভা ৭নং ওয়ার্ড জালিয়াপাড়া ট্রানজিট জেটি ঘাট সংলগ্ন নাফনদীর দু'দেশের মধ্যবর্তী জলসীমায় আরাকান আর্মির পতাকা বাহি দুটি ট্রলারে করে এই ২৪ জেলেকে টেকনাফ-২ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ফেরত আসা ২৪ জন জেলের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক। বাকি ৬ জন দেশে আশ্রিত মিয়ানমার রোহিঙ্গা নাগরিক।
এদিকে ট্রানজিট জেটিঘাটে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফেরত নিয়ে আসা জেলেদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে: কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন অত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস,এম অনীক চৌধুরী, কোস্টগার্ড,পুলিশ, মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তাবৃন্দ।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিজিবি অধিনায়ক বলেন, সাগর ও নদীতে মাছ শিকার করার সময় বাংলাদেশী জেলেরা প্রায় সময় দেশীয় জলসীমা শূন্যরেখা অতিক্রম করে সেদেশের জলসীমায় প্রবেশ করার দায়ে বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠি আরাকান আর্মির হাতে ধরা পড়ে। এরপর থেকে আটকা পড়া জেলেদের ফেরত আনতে বিজিবির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। অবশেষে বিজিবির সার্বিক প্রচেষ্টায় এই ২৪ জেলেকে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করার পর তাদেরকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান বিজিবির এই কর্মকর্তা।
আরাকান আর্মির জিম্মি দশা থেকে দীর্ঘ ৯ মাস পর ফেরত আসা শাহপরীর দ্বীপ ডাঙ্গর পাড়া এলাকার বাসিন্দা মন্জুর আলম সময়ের কন্ঠস্বরকে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা একই এলাকার ৯ জন মাঝিমাল্লা একটি ফিশিং ট্রলারযোগে সাগরে মাছ শিকারে যায়। এরপর মাছ শিকারত অবস্থায় হঠাৎ করে আরাকান আর্মির সদস্যরা এসে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের নিয়ে যায়। সেখানে তাদেরকে কাজ কষ্ট দায়ক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতো। কাজের মধ্যে একটু সমস্যা হলেই নির্মম ভাবে মারধর করতো। এই ভাবে কেটে গেলো নয়টি মাস। অবশেষে বিজিবির সার্বিক সহযোগিতা স্বদেশে ফেরত আসতে ফেরে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছেন।
১৪ মাস পর ফেরত আসা জেলে টেকনাফ পৌরসভা মধ্যম জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত মোহাম্মদ হোসেন'র পুত্র আব্দুল করিম বলেন, নাফনদে ভেঙ্গী জাল দিয়ে মাছ শিকারত অবস্থায় আরাকান আর্মির সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে অনেক বার ফেরত আসার জন্যও চেষ্টা করেছি। আমাকে ফেরত দিবে বলে আমার পরিবারের কাছ থেকে বেশ কয়েক বার টাকা নিয়েছিল তারা।
আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকা বাংলাদেশী জেলেদের উপর অনেক নির্যাতন করতো তারা। প্রতিদিন ৮/৯ ঘণ্টা করার নির্দেশ দিতো। ঠিক মতো খেতে দিতো না। আরাকান আর্মির জিম্মি দশায় রোহিঙ্গাসহ আরও দেড় শতাধিক জেলে আটক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের সার্বিক সহযোগিতায় ২৪ জেলেকে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে বিজিবি। একই ধারাবাহিকতায় সেখানে আটক থাকা জেলেদেরকেও পর্যায় ক্রমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেদের আরো বেশি সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে কোন ভাবেই দেশীয় জলসীমা অতিক্রম করা যাবে না বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
বিজিবির তথ্য সুত্রে দেখা যায়, বিগত ২০২৫ (১ জানুয়ারি) থেকে ২০২৬ সালের (১৯ আগস্ট) পর্যন্ত মিয়ানমার বিদ্রোহী গোষ্ঠি আরাকান আর্মি কর্তৃক বাংলাদেশী ও এফডিএমএন জেলে আটক হয়েছে ৪৩৪ জন জেলে। এর মধ্যে বাংলাদেশী ২২২ জন, রোহিঙ্গা (এফডিএমএন) ২১২ জন। সীমান্ত প্রহরী বিজিবির সহায়তায় এই পর্যন্ত ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশী-১৫৭ জন,রোহিঙ্গা (এফডিএমএন) ১৯১ জন। ফেরত না আসা আরো ৮৬ জন জেলে আরাকান আর্মির হাতে আটক রয়েছে। তার মধ্যে ৬৫ জন বাংলাদেশী জেলে, ২১ জন দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জেলে।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.