
আখতার হোসেন খান, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আবু সাঈদ স্বপনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
গত ৩ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে উপসচিব জিয়াউর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
শনিবার (৯ মে) দুপুরে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুব হাসান বরখাস্তের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, 'বরখাস্তের চিঠি আমরা পেয়েছি। আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাঈদ স্বপনের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্সের টাকা আত্মসাৎ, ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় ২৮৬ জন সুবিধাভোগী বাছাইয়ে অনিয়ম, তৃতীয় প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে নিজ এলাকায় টিআর ও কাবিখা প্রকল্প গ্রহণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রণোদনা বিতরণে অনিয়ম এবং ডি.ডব্লিউ.বি কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে এসব অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে আইনবহির্ভূত। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪(৪) এর (খ) ও (ঘ) ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় একই আইনের ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের সাতজন সদস্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, নিয়মিত সভা বা রেজুলেশন ছাড়াই প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাঈদ স্বপন সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দ ও উন্নয়ন ফান্ড থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ভিজিডির ২৮৬টি কার্ডের মধ্যে মাত্র ৬০টি ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে বিতরণ করা হলেও বাকি কার্ডগুলো তার ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে দেওয়া হয়। এছাড়া ভিজিএফ কার্ড বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে নিজের গ্রাম আগতেরিল্যা এলাকায় কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং কৃষি প্রণোদনার বড় অংশ নাম-বেনামে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
এর এক মাসের মধ্যেই আবারও তার বিরুদ্ধে সরকারি ভিডব্লিউবি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) কর্মসূচির প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, সুবিধাভোগীদের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে জমা না রেখে টানা তিন মাস নিজের কাছে রেখেছিলেন তিনি।
এই দুই ঘটনার পর একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ভিডব্লিউবি সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিমা আক্তার। তদন্তে তিনি অভিযোগের সত্যতা পান এবং স্বপনকে দায়ী করেন। অন্যদিকে ইউপি সদস্যদের দায়ের করা অভিযোগ তদন্ত করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্স, সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ ও উন্নয়ন ফান্ডে অনিয়মসহ প্রায় সব অভিযোগেরই প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে প্যানেল চেয়ারম্যান আবু সাঈদ স্বপনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে সত্য উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। পরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আবু সাঈদ স্বপনকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফলদা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আবু সাঈদ স্বপন মুঠোফোনে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলোর বিষয় উল্লেখ করে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি পেয়েছি।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.