
কুবি প্রতিনিধি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রদলের কর্মীদের নিয়ে জোরপূর্বক এক কর্মচারীর জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কর্মচারী জহিরুল ইসলাম গত ৫ মে (মঙ্গলবার) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম মনিরুজ্জামন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত, মালী কামাল ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী হাসান ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর নামে এ অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযুক্ত শিক্ষক জি. এম মনিরুজ্জামান আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং আবুল হায়াত বঙ্গবন্ধু পরিষদ থেকে আওয়ামী সরকার আমলে কুবি শিক্ষক সমিতিতে যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন৷ আর যে-সব শিক্ষার্থীদের নামে অভিযোগ করেছেন, তাদের সবাই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানা যায়। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো ফুটেজও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ১০-১৫ জনের নামে অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রতিবেদকের হাতে আসা ভিডিয়োতে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ৮ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
তারা হলেন, বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল মালেক আকাশ, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুদ, একই বর্ষের আইন বিভাগের আজহারুল ইসলাম ইমরান, ইংরেজি বিভাগের জহিরুল ইসলাম জয়, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সৌরভ কাব্য এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী খান মোহাম্মদ নাঈম। এছাড়াও ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের মোহাম্মদ শাহিন নামেও আরেক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
বাকি দুজনের নাম জানা যায়নি। শাখা ছাত্রদলের একটি সূত্র জানায়, সাইফুল মালেক আকাশ, জহিরুল ইসলাম জয়, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুদ ও খান মোহাম্মদ নাঈম এ ঘটনার নেতৃত্ব দেন। এ বিষয় নিয়ে তাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। অভিযোগপত্র ও ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ১ নং বিজয়পুর লালমাই পাহাড়ের ধনমোরা এলাকায় মোছলেম মিয়ার কাছ থেকে ২০১৯ সালে ৩০ শতক ভূমি ক্রয় করেন জহিরুল ইসলাম (যার আর. এস খতিয়ান নং- ৯৩৪ ও বি. এস খতিয়ান নং- ১২৭২, সাবেক দাগ নং- ৫৫৪৩ ও হাল বি.এস দাগ নং- ১১৪৯৫)। একই পাহাড়ে পাশাপাশি হালিমা নামের এক নারীর কাছ থেকে ৩০ শতক জমি ক্রয় করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম মনিরুজ্জামান ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত।
এই জায়গার পূর্বের মালিক ছিলেন মো. আবদুল মোতালেব ও আবদুল গফুর। এর মধ্যে আবদুল মোতালেবের অংশ ১০ শতক আর আবদুল গফুরের অংশ রয়েছে ২০ শতক (যার বি. এস খতিয়ান নং- ১২৭২, সাবেক দাগ নং- ৫৫৪৩ ও হাল বি. এস দাগ নং- ১১৪৯৬)। তবে জি. এম মনিরুজ্জামান ও আবুল হায়াত সংশোধিত দলিল মূলে আবদুল গফুরের ১১৪৯৫ দাগের ২০ (বিশ) শতক ভূমির মালিক হন। ভুক্তভোগী জহিরুল ইসলাম বলেন, "গত ২ মে সকাল ১১টার দিকে ধনমোড়া পাহাড়ে গিয়ে আমার জায়গা দখল করেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম মনিরুজ্জামান ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত। তাদের সাথে ছিলেন মালী কামাল হোসেন এবং কুবি শাখা ছাত্রদলের ৯ জন কর্মী।
" অভিযোগ অনুযায়ী, এই দখল কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দেশেই পরিচালিত হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, জমি দখলের প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী বলেন, "ওখানে যাওয়া শিক্ষার্থীরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলে, 'এই খুঁটিগুলো তুললে তোর হাত ভেঙে ফেলব। আমরা যেটা করেছি সেটাই রাইট (সঠিক)। থানায় মামলা করিস, সবাই আমাদেরকে চিনে।' স্যারেরাও একই কথা বলেছেন।" তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত পক্ষ তার জমির পূর্ব পাশে বিভিন্ন দাগ ও খতিয়ানের আওতায় পৃথকভাবে জমি ক্রয় করলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার নিজস্ব জমি অবৈধভাবে দখল করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম মনিরুজ্জামান বলেন, "আমাদের জমিগুলো পাশাপাশি। আমরা তাকে বলেছি, তুমি যার থেকে জমি কিনেছ তাকে ডাকো এবং একজন আমিন (ভূমি পরিমাপক) ডাকো; আমরাও আমাদের জমির পূর্বের মালিক ও আমিন ডাকব। তখন আলোচনার মাধ্যমে এটা সমাধান করা যাবে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট একটা চাকরি করে, সে ভুল করতেই পারে। কিন্তু সে আমাদের সাথে তখন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে।" বিরোধপূর্ণ জমিটি যেহেতু শিক্ষক ও কর্মচারীর এবং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যেত, সেখানে কেন শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হলো এবং তারা কেন হুমকি দিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমরা কাউকে সাথে করে নিয়ে যাইনি। তারা হয়ত নতুন ক্যাম্পাস দেখতে গিয়েছিল। ফেরার সময় শিক্ষকদের সাথে কর্মচারীর বাগ্বিতণ্ডা দেখে সেখানে এগিয়ে আসে। তবে তারা কোনো হুমকি দেয়নি। আমরা অবশ্যই আইনের মাধ্যমেই এটা সমাধান করতে চেয়েছি, কিন্তু সে মানেনি।
আমরা এখনো চাচ্ছি এটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হয়ে যাক। আমরা সবাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি, একই পরিবারের অংশ।" একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত। তিনি বলেন, "এই জমিটা আমরা তিনজন ২০১৯ সালে কিনেছি। সে তিন-চার মাস আগে এসে বলছে সে জায়গায় রাস্তা বেশি পাবে। ইন দ্য মিন টাইম (এরই মধ্যে) সে আমাদের জায়গার গাছ কেটে ফেলেছে।" শিক্ষার্থীদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীরা ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা এসে জাস্ট (শুধু) তাকে জিজ্ঞেস করেছে যে সে কেন শিক্ষকদের সাথে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছে।" কিন্তু ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকরা তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, "শিক্ষকদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় তারা আমাদেরকে বলেছে যে তারা একটা বিপদে পড়েছে। আমরা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-কোনো সমস্যায় যাই তাই এখানেও গিয়েছি।
কাউকে কোনো হুমকি দেইনি বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী দেখে তাকে বলেছি, মামা আপনারা বসে আলোচনা করে এটা সমাধান করে ফেলেন এবং তিনিও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। এখানে টাকা-পয়সার কোনো কথাই আসেনা। এটা ভিত্তিহীন।" আরেক অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মাহমুদ মাসুদ বলে, "আমরা ঐদিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম, গিয়ে দেখি আমার ডিপার্টমেন্টের একজন স্যার আর ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন স্যার, এমনি তারা পূর্ব পরিচিত তো তাদের সাথে কথা বললাম, এতটুকুই। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কে অভিযোগ দিয়েছে বা কার জায়গা জমি আমি জানি না কিছু। খুঁটি বসানোর মতো কোনো কিছু আমি দেখিনি। এমনিতে তারা কথা বলছিল তা দেখে আমরা চলে আসি।" এ বিষয়ে আরেক অভিযুক্ত মোহাম্মদ শাহীন বলে, শিক্ষকদের সমস্যার কথা শুনে আমরা সেখানে গিয়েছি।
যেহেতু ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলো, তাই সেই ডিপার্টমেন্টের আমার বন্ধু জহিরুল আমাকে বলেছে টিচারদের জমি মাপবে সেখানে যাওয়ার জন্য। জমি মাপা শেষ হচ্ছিলো না, তাই আমি দুইটার দিকে চলে এসেছি।" এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “এ বিষয়ে আমি এখনো অবগত নই। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি যাচাই করা হবে।
কেউ যদি ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকে, তাহলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।” এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি এ অভিযোগ পেয়েছেন।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.