
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তর। উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও যেন তা থামছেই না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরবরিকালচার বিভাগসহ একাধিক খাতে ভুয়া বিল, গাছ বিক্রি, বানোয়াট বিজ্ঞাপন ব্যয় এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুর্নীতির অভিযোগে ‘প্রভাবশালী’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী মহল মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামকে ‘দুর্নীতির মহানায়ক’ বলেও আখ্যায়িত করছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি নিয়ন্ত্রণ এবং ভুয়া বিল–ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ শুরু না হতেই অগ্রিম ও পূর্ণ বিল পরিশোধ, অস্বাভাবিক বিজ্ঞাপন ব্যয় এবং আরবরিকালচার বিভাগে পরিকল্পিত অনিয়ম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম অংশ।
অসম্পন্ন কাজেই পূর্ণ বিল, ‘ওটিএম কেলেঙ্কারি’:
প্রতিবেদকের হাতে আসা অভিযোগ ও নথি অনুযায়ী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সানাউল্লাহর মাধ্যমে মনিরুল ইসলাম তার পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ম ভেঙে ওপেন টেন্ডার মেথডে একাধিক কাজ পাইয়ে দেন। এসব কাজ এখনো অসম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখিত কাজগুলোর আইডি নম্বর হলো— 997828, 997827, 997826, 997825, 995647, 994880, 994647, 994646, 994817 ও 994818।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের যথাযথ তদন্ত হলেই কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
টেন্ডার বাণিজ্যে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট:
মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত এক দশকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তিনি সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় একটি প্রভাবশালী অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা এখনও সক্রিয় রয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জন্য এলটিএম বাদ দিয়ে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। অনিয়মের অভিযোগ থাকা দরপত্র আইডিগুলো হলো— 1056148, 1057945, 1056137, 1056138, 1056145, 1057947, 1057196, 1056073, 1057101 ও 1018075।
আরবরিকালচার বিভাগে ভুয়া বিল ও গাছ বিক্রির অভিযোগ:
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জড়িত আরবরিকালচার বিভাগকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, মনিরুল ইসলাম তার অনুসারী কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে ভুয়া ফুল ও গাছ রোপণের বিল তৈরি করেন। বাস্তবে কাজ না করেই কিংবা কম কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়। একই সঙ্গে বানোয়াট বিজ্ঞাপন ব্যয় দেখিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
‘দুর্নীতির বরপূত্র’দের নেটওয়ার্ক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকার এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগ এবং ঢাকার বাইরেও যেসব নির্বাহী প্রকৌশলী দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তিমূলক বদলির শিকার হয়েছেন, তাদের একটি অংশ মনিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বদলি হলেও নানা কৌশলে তাদের সহযোগিতায় অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং বিশ্বাসযোগ্য। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সরকারি অর্থ লুটপাটের একটি বড় সিন্ডিকেটের চিত্র উঠে আসতে পারে।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি বক্তব্য জানতে চেয়ে পাঠানো খুদেবার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.