
মোঃ খাইরুল ইসলাম, কামারখন্দ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: চৌবাড়ী বাজার পেরিয়ে সলপের আঞ্চলিক সড়কের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ চোখে পড়ে দোতলা সাদা একটি ভবন। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি হাসপাতাল। কাছে যেতেই লোহার গেটে ঝোলানো পুরাতন তালা আর মাকড়সার জাল জানান দেয় এখানে মানুষের আনাগোনা নেই বহুদিন। ফটকের ওপর লেখা,চৌবাড়ী ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। নাম আছে, ভবন আছে, অথচ নেই চিকিৎসাসেবা। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ,বেলকুচি ও উল্লাপাড়া উপজেলার পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা ভেবে এখানে নির্মাণ করা হয়েছিল ২০ শয্যার এই হাসপাতাল।
প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ভবনটির কাজ শেষ করে হস্তান্তর হয় ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু প্রায় আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটির দরজা আজও সাধারণ মানুষের জন্য খোলেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন চিত্র। হাসপাতাল চত্বর জুড়ে আগাছার দাপট। কোথাও ঘাস কোমর সমান। মূল ভবনের প্রবেশপথে ময়লা জমে আছে। মাকড়সার জালে ঢেকে আছে করিডোর। জানালার কাচ ভাঙা। দেয়ালে ধুলোর আস্তরণ। যেখানে থাকার কথা রোগীর শয্যা, সেখানে এখন ফাঁকা কক্ষ আর নিস্তব্ধতা। হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় এখানে কোনো জনবল বা নিরাপত্তা প্রহরী নেই।
আর এই শূন্যতাকেই কাজে লাগিয়েছে চোরচক্র। কামারখন্দ উপজেলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, চৌবাড়ির ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের রান্না ঘরের পেছন গেটের উপর দিয়ে ঢুকে দরজা ভেঙে চুরি হয়েছে ৫৫টি সিলিং ফ্যান, ৯০টি লাইট, প্রতিটি ইউনিটের সার্কিট ব্রেকার, ওয়াশরুমের স্যানিটারি ফিটিংস, একটি এসির আউটডোর ইউনিট, পাওয়ার স্টেশনের ট্রান্সফরমার, জেনারেটরের কয়েল, ব্যাটারি ও তামার তার সব মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার সরঞ্জাম উধাও হয়েছে। কামারখন্দ উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন উদ্দিন জানান,ভবন খালি থাকায় প্রায় ৪০ লাখ টাকার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও জনবন সংকট এজন্য ওইখানে নাইটগার্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি আমি শোনার পরে সরেজমিনে পরিদর্শন করি। কামারখন্দ থানার পুলিশকে বেশ কয়েকবার মৌখিক অভিযোগ দেয় এরপর লিখিত অভিযোগ করি। পরে সেটি মামলা হয়। আর এটা যখন হস্তান্তর করা হয় তখন আমি এখানে ছিলাম না।
সিরাজগঞ্জ প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাটির প্রাকল্পিত মূল্য ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। হাসপাতালটির কাজ শুরু হয় গত ২০১৮ সালের ২৪ নভেম্বর আর কাজ শেষ হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। আর এ কাজটি করেন DMCL AND PC -JV নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, এখানে রয়েছে দুটি স্টাফ কোয়ার্টার, একটি দোতলা ডক্টরস কোয়ার্টার, ড্রাইভার গ্যারেজসহ বাসা, পাওয়ার স্টেশন, রান্নাঘর ও মূল দোতলা ভবন। কিন্তু এখন এসব ভবনে ডাক্তার নয়, বাসা বেঁধেছে নীরবতা। একটি স্টাফ কোয়ার্টার ও মূল ভবনেও ফাটল দেখা গেছে, আরেকটিতে জানালার কাচ নেই। রান্নাঘরটি পরিত্যক্ত থাকায় সেটিই হয়ে উঠেছে চোরদের প্রবেশপথ। মূল ভবনের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, হাসপাতালের চেয়ার টেবিল, বিদ্যুৎ লাইনের তার কাটা, অপারেশন থিয়েটার, জরুরী সেবা, মেডিকেল ডক্টরস চেম্বার, রিসিপশনসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রে ধুলাবালির আস্তরণ ও এলেমেলোভাবে রয়েছে।
কামারখন্দ উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মো. আবু সাঈদ বলেন, নিয়মিত চুরি হচ্ছে। ঘটনার স্থলে পুলিশ পরিদর্শন করেছে। সেখানে আমি গিয়েছিলাম। স্থানীয়রাও আমাদের অভিযোগ করেছে হাসপাতালে ভিতরে ঢুকে মাদকসেবন করা হয়। সার্বিক বিষয়েও স্যারদেরকে জানিয়েছি। চৌবাড়ি গ্রামের গোলাম আজম চৌধুরী বলেন, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় আমরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি অন্যদিকে সরকারি সম্পদ চুরি হচ্ছে। এখানে নানান ধরনের মাদক সেবনসহ অসামাজিক কার্যকলাপ হয় বলেও গ্রামের মানুষের কাছে থেকে শুনেছি। কতৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। চৌবাড়ী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তোজ্জামেল হক বলেন, এই চৌবাড়ি এলাকায় দুইটি হাইস্কুল, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি কেজি স্কুল, একটি মাদ্রাসা ও একটি কলেজ রয়েছে। এখানে হাসপাতালটি চালু হলে এই শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা নিতে পারতো।
হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীও স্থানীয়রা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত চালু করা হোক। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাস্থ্য সেল কেন্দ্রীয় সদস্য হুজাইফা সম্রাট রাব্বি বলেন, চৌবাড়ির ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। আমি কতৃপক্ষকে অনুরোধ করবো সিভিল সার্জন, ডিসি অফিস ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় এবং দ্রুত হাসপাতালটি যেন চালু করে। হাসপাতালটি চালু হলে কামারখন্দ,বেলকুচি ও উল্লাপাড়ার পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষজন সেবা পাবে। এটা নিয়ে আমিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত দিয়েছি। কামারখন্দ থানার পুলিশের এসআই মো. বাবুল আক্তার বলেন , লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সার্কেল স্যারকে নিয়ে পরিদর্শন করেছি। এখানে জনবল নিয়োগ না থাকার কারণে বিভিন্ন সময় চুরির ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিবো। জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ নুরুল আমীন বলেন, কামারখন্দের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালেই জনবল সংকট রয়েছে। এজন্য চৌবাড়িতে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জনবল দেওয়া সম্ভব হয়নি। চুরির বিষয়ে মামলা হয়েছে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.