
খালিদ হাসান, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: বর্ষাকালে কিংবা বন্যায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। তখন গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, স্কুলগুলো বন্ধ থাকে, মাসের পর মাস শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত হয়। এমন বাস্তবতা থেকেই নতুন ভাবনার সূচনা করেছিলেন চলনবিলের সন্তান স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ান।
২০০২ সালে তিনি স্থানীয় একটি নৌকাকে স্কুলে রূপান্তর করেন—যা বিশ্বের প্রথম ভাসমান স্কুল হিসেবে পরিচিতি পায়। এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগের মাধ্যমেই বদলে যায় চলনবিল অঞ্চলের শিক্ষার চিত্র। সম্প্রতি স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ানের সৌরচালিত ভাসমান স্কুল পেয়েছে ইউনেস্কোর মর্যাদাপূর্ণ কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫। শিক্ষায় নতুন উদ্ভাবন ও জীবনব্যাপী শিক্ষা প্রসারে এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা সম্মাননা, যা চীনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদান করা হয়।
গতকাল শুক্রবার সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। চলনবিলের জলরাশি থেকে জন্ম নেওয়া এই স্থানীয় উদ্ভাবন আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাক্ষরতা, টেকসই নকশা ও জলবায়ু অভিযোজনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে এটি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে নাইজেরিয়া, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ বহু দেশে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার ভাসমান স্কুল মডেলকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০৫০-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বর্তমানে রেজোয়ানের উদ্যোগে ১০০টিরও বেশি নৌকা স্কুল, লাইব্রেরি ও ক্লিনিক হিসেবে কাজ করছে। এসব নৌকা-স্কুলে এখন পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী সাক্ষরতার আলো পেয়েছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইমিগ্রেশন হিস্ট্রি-তে চলছে “বোট স্কুলস অব বাংলাদেশ—ফিউচার দ্যাট ফ্লোটস” শিরোনামের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এছাড়া টিআরটি ওয়ার্ল্ডের তথ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ টার্নস টাইড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ উইথ ফ্লোটিং স্কুলস’ নির্বাচিত হয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর ফাইনালিস্ট হিসেবে।
এমনকি স্থপতি রেজোয়ানের কাজ স্থান পেয়েছে জুলিয়া ওয়াটসনের আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত বই ‘লো-টেক: ওয়াটারে’-তে, যেখানে বিশ্বের ২২টি ঐতিহ্যভিত্তিক আধুনিক উদ্ভাবন তুলে ধরা হয়েছে। মোহাম্মদ রেজওয়ান বলেন, “বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নারী ও কন্যাশিশুরা। তাই আমাদের প্রকল্পে শিক্ষাকে তাদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও আরামদায়ক করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এমনকি চারপাশে পানি থাকলেও পড়াশোনা বন্ধ হয় না।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরামর্শ হলো—যন্ত্রের চেয়ে মানুষকে গুরুত্ব দিন। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে। এজন্য ভাসমান স্কুলগুলো স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতেই তৈরি করা হয়েছে, আর এর পরিচালনায় রয়েছেন স্থানীয় নারী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
” চলনবিলের বুক থেকে উঠে আসা এই নৌকা-স্কুল আজ বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের সৃজনশীলতা ও মানবিক উদ্ভাবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন।
Copyright © 2026 সংবাদের আলো. All rights reserved.